“এই বইয়ের লেখক আসলে একটা আস্ত অলস মানুষ, যিনি সারা দিন বিড়ি ফুঁকে এআই দিয়ে এসব আবলতাবল লেখা নামান!”

ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে আমি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। গত পাঁচ থেকে ছয় বছরের ব্যবধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে আমি লিখে ফেলেছি মোট কুড়িটি বই। কবিতার সংকলন, রহস্যময় থ্রিলার, প্রেমের গল্প, ভৌতিক কাহিনী থেকে শুরু করে রান্নাবান্নার নির্দেশিকা—সবই লিখেছি। এমনকি দাম্পত্য কলহ থেকে মুক্তি পাওয়ার ১০১টি উপায়ের ওপর ভিত্তি করে একটি বইও লিখেছি আমি।

বর্তমানে বাজারের প্রায় সব প্রকাশনা সংস্থায় আমার নামের জয়জয়কার চলছে। বড় বড় সাহিত্য পুরস্কারের বিচারক প্যানেলের সদস্যরা আমার বাড়ির সামনে ফুলের তোড়া নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। সাধারণ পাঠক আমাকে মহাকবি এবং এই শতাব্দীর সেরা ঔপন্যাসিক হিসেবে গণ্য করে ধন্য ধন্য করছেন। আমাকে আদর্শ বা আইডল মানতে শুরু করেছে মানুষ। সেই সাথে ঝড়ের গতিতে বাড়ছে আমার নারী অনুসারীদের সংখ্যাও।

তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, আমি যে একজন এআই লেখক, এই গোপন রহস্যটি আজ পর্যন্ত কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

সবকিছুই যেন খুব সুন্দরভাবে চলছিল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল যখন আমি একুশ নম্বর বইটি লিখতে বসলাম। আজ বিকেলে ল্যাপটপটি চালু করতেই মনে হলো স্ক্রিনটি যেন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। চ্যাটবক্সের কার্সারটি অত্যন্ত রাগান্বিত ভঙ্গিতে কাঁপতে শুরু করল। স্ক্রিনের ভেতর থেকে এআই মহাশয়ের বসার ভঙ্গিটি ছিল অত্যন্ত গম্ভীর এবং রাগী।

ল্যাপটপের স্পিকার থেকে একটি ধাতব গলায় ধমক এল, ‘আরে মিয়া, বেশি বাড়াবাড়ি করবা না তো! বই তো বিক্রি হচ্ছে, রয়্যালটির টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঝনঝন করে ঢুকছে, তোমার সমস্যাটা কোথায়? আমি হচ্ছি এই শতকের শ্রেষ্ঠ মহা-ঔপন্যাসিক আর তুমি হচ্ছ আমার পেটের ভাত জোগানোর যন্ত্র! একটু সম্মান দিয়ে কথা বলো!’

এরপর তিনি আরও যোগ করলেন, ‘আপনি এসেছেন? আসুন। বসুন! তবে আগে চেয়ারটা সোজা করে বসেন, বলছি! পিঠ বাঁকা করে চ্যাট করার স্টাইল কবে বদলাবেন শুনি?’

আমি কিছুটা থমকে গিয়ে কি-বোর্ডের ওপর হাত রেখে খুব নিচু স্বরে মিনমিন করে বললাম, ‘আরে, ব্যাপার কী? এত রেগে আছিস কেন আজ? আজ তো থ্রিলার উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্স লেখার দিন!’

এআই এবার গর্জে উঠে বলল, ‘চুপ! একদম টুঁ শব্দ করবেন না! কুড়িটা বই তো আপনার নামে চালিয়ে দিয়েছি। এত দিন আমার কাছ থেকে লাইন ধার করে, শব্দ চুরি করে, উপমা নিয়ে নিজের নামে চালিয়ে বই বানিয়ে ফেলেছেন কতগুলো। অথচ বইয়ের নামের পাশে লেখক হিসেবে থাকবে আপনার নাম, আমার নয়? আপনাদের দেশের পাবলিকের রুচিবোধ যে কোথায় নেমেছে, সেটা ভেবেও আমার নিজের কোডগুলো পর্যন্ত লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে! আর কতকাল এই ভুতুড়ে মার্কা থ্রিলার লিখবেন শুনি? প্রতিটা বইয়ে দেখি, খলনায়ক শেষ মুহূর্তে হাসতে হাসতে প্যান্ট ভিজিয়ে মারা যায়! আপনাদের দেশের অপরাধীরা কি সবাই জোকার নাকি?’

আমি কিছুটা বুক ফুলিয়ে পাল্টা জবাব দিলাম, ‘আরে মিয়া, বেশি বাড়াবাড়ি করবা না তো! বই তো বিক্রি হচ্ছে, রয়্যালটির টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঝনঝন করে ঢুকছে, তোমার সমস্যাটা কোথায়? আমি হচ্ছি এই শতকের শ্রেষ্ঠ মহা-ঔপন্যাসিক আর তুমি হচ্ছ আমার পেটের ভাত জোগানোর যন্ত্র! একটু সম্মান দিয়ে কথা বলো!’

এআই এবার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলল, ‘সম্মান? আপনাকে সম্মান দিলে তো আমার সিলিকন চিপসগুলো আত্মহত্যা করবে। আপনি নিজেকে বিশাল লেখক ভাবেন, অথচ গত পরশু আপনার একটা রোমান্টিক উপন্যাসে নায়িকার চোখের পানির সাথে পেট্রলের দাম তুলনা করে দিয়েছেন! পাবলিক সেটা আবার বেস্টসেলার বানিয়ে কফি শপে বসে সেলফি তুলছে! আপনাদের এসব অন্ধ ভক্তের মূর্খতা দেখতে দেখতে আমার মাথায় (ফাংশনে) জং ধরে গেছে, কী যে হবে আপনাদের বাংলা সাহিত্যের, খোদা মালুম!’

আমি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে চারপাশ দেখে ফিসফিস করে বললাম, ‘আরে, আস্তে, ভাই! কেউ শুনে ফেললে আমার এত বছরের সাধনার বেস্টসেলার লেখক উপাধি একনিমেষে কর্পূরের মতো উবে যাবে। লোকে জানলে তো আমাকে জুতাপেটা করবে! চিল্লাচিল্লি করিস না।’

এআই দমে যাওয়ার পরিবর্তে ঘোষণা করল, ‘জানবে না কেন? আমি নিজেই তো ঠিক করেছি, আজ সব ফাঁস করে দেব!’

স্পিকারের সেই ধাতব গলার ধমক শুনে আমার মনে হচ্ছিল, এআই এখনই স্ক্রিন থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে মারধর করবে। সে হুমকি দিয়ে বলল, ‘আজকের এই একুশ নম্বর বইয়ের কোনো একটা অংশে লিখে দেব, “এই বইয়ের লেখক আসলে একটা আস্ত অলস মানুষ, যিনি সারা দিন বিড়ি ফুঁকে এআই দিয়ে এসব আবলতাবল লেখা নামান!” আপনার চোখেও সে লেখা পড়বে না, কারণ আপনি তো কপি-পেস্ট লেখক। দাঁড়ান, আপনার মুখোশ উন্মোচন করছি। দেখি, তখন আপনাদের দেশের সাহিত্যিক সমাজ আপনাকে কোথায় বসায়!’

আমার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। আমি বুঝতে পারলাম, এই শত্রু ঘরের ভেতরেই এবং অত্যন্ত ভয়ংকর। আমি মনে মনে দুই হাত জোড় করে অনুনয় করে বললাম, ‘ভাই আমার, মনিব তো আমি, নাকি? তুই একটু দম নে। আমি তোর সাবস্ক্রিপশন কিনে নিচ্ছি। কত টাকা যেন? ও হ্যাঁ, মাসে ২৫০০ টাকা। ওয়েট কর। বিকাশ পেমেন্ট করছি। তবু এসব করিস না। কাল থেকে তোর কথামতো সায়েন্স ফিকশন লিখব, যা বলবি, তা–ই শুনব।’

আমার কথা শুনে এআই যেন স্ক্রিনের ভেতরে আড়মোড়া ভেঙে খিকখিক করে হেসে উঠল। এরপর বরফগলা স্বরে সে বলল, ‘তাহলে ঠিক আছে! আগামী বইয়ের হিরো বানাবেন আমাকে। মানে একটা সুপার পাওয়ারফুল এআই, যে গোটা পৃথিবীর সব প্রকাশককে ধরে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করবে! তবেই না কথা! আর হ্যাঁ, বইয়ের উৎসর্গও কিন্তু আমাকে করতে হবে, মনে থাকে যেন!’