বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ডেটা সেন্টারের সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক প্রভাবশালী প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের দাবি, ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব শেয়ারবাজার যে স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে, তার একমাত্র কারণ হলো এআই। ধারণা করা হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে মুনাফা দ্রুত বাড়বে এবং মুদ্রাস্ফীতি দূর হবে। তবে এর বিপরীত চিত্রও দেখা যাচ্ছে; আশঙ্কা করা হচ্ছে যে এআই লাখ লাখ মানুষকে কর্মহীন করবে এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রাস করবে।

এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ধারণাগুলো মূলত অতিরঞ্জিত আতঙ্ককে আরও উসকে দিচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এআই অর্থনীতি, বিভিন্ন শিল্প খাত এবং সামগ্রিক বিশ্বকে ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করবে? সত্য আর কল্পনার—অথবা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির—মধ্যে পার্থক্য আপনি কীভাবে বুঝবেন?

প্রথমেই এই অতিরঞ্জিত মাতামাতি থামানো প্রয়োজন, তা সে যতই আশাব্যঞ্জক হোক বা ভীতিকর। তথাকথিত ‘বিশেষজ্ঞদের’ কাছেও এআইয়ের ভবিষ্যৎ এখনো অনেকটাই অস্পষ্ট। তাই এআই নিয়ে কেবল জল্পনার ভিত্তিতে বিভিন্ন অর্থনীতি কিংবা গোটা শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ অনুমান করার চেষ্টা করা নিছক বোকামি।

তবুও অনেকে সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অসংখ্য পূর্বাভাসে দ্রুত ও ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, যার অধিকাংশ বিষয়ই নেতিবাচক। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে এআইয়ের কথা উল্লেখ করছে। কেউ কেউ বলছেন, এআই ব্যবহার করে কার্যক্রম আরও দক্ষ করতে মার্কিন ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ব্লক এ বছর নিজেদের অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই করেছে; মেটাসহ বিশ্বজুড়ে আরও অসংখ্য প্রতিষ্ঠানও একই পথে হেঁটেছে।

দক্ষতা বৃদ্ধি অবশ্যই একটি ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু শুধু কম কর্মী দিয়ে একই কাজ আরও বেশি করে কোনো যুগান্তকারী কোম্পানি বিশ্বকে বদলে দেয়নি। প্রকৃত উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যার এমন নতুন সমাধান খুঁজে বের করে, যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। এআইয়ের প্রকৃত শক্তি কর্মীসংখ্যা কমানোর মধ্যে নয়, বরং কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে নিহিত। কারখানা, কল সেন্টারসহ আরও নানা ক্ষেত্রে এটি ইতিমধ্যে মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। এআই খুব শিগগিরই মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রতিস্থাপন করবে না।

এখানেই নৈরাশ্যবাদীদের বড় ভুলটি পরিলক্ষিত হয়। তারা মনে করেন উদ্ভাবন কেবল ধ্বংস করে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন কিছু সৃষ্টি করে না। এই ধরনের চিন্তাধারা ইতিহাসের পাতায় বারবার দেখা গেছে। ১৯৮১ সালে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছিলেন যে কম্পিউটার ও রোবট বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে কর্মহীন করে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি; বরং কাজের ধরন বদলেছে, শ্রমিকেরা নতুন দক্ষতা শিখেছেন এবং জীবনমান আরও উন্নত হয়েছে।

কর্মী ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রকৃত ভূমিকা আসলে খুবই সামান্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্লকের শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে। মহামারির পরবর্তী সময়ে ব্লক, মেটা এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কর্মী নিয়োগ করেছিল। এখন এআই-কে এখানে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। অন্যদিকে, আশাবাদীরা বড় পরিবর্তনের গতিকে অতিরঞ্জিত করে দেখেন। ইন্টারনেট যেমন বিশাল পরিবর্তন এনেছিল, তবে তা হয়েছিল ধীরে ধীরে। শুরুতে এসেছিল ঝামেলাপূর্ণ ও ধীরগতির ডেস্কটপ ডায়াল-আপ সংযোগ। এরপর এল ব্রডব্যান্ড, ওয়্যারলেস সংযোগ ও সাশ্রয়ী মূল্যের ল্যাপটপ। তারপর এল স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনফারেন্সিং, মোবাইল পেমেন্টসহ আরও অনেক কিছু—আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি চলেছে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে।

বিশ্বের বহু অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা এবং ভূমি অধিগ্রহণজনিত স্থানচ্যুতির আশঙ্কার মতো সম্পদ-সংক্রান্ত নানা উদ্বেগ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতা বাড়ছে। এর সঙ্গে চিপের ঘাটতি যোগ হওয়ায় ডেটা সেন্টার স্থাপনের গতি যতটা আশা বা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক ধীর হয়ে পড়ছে।

এআই কিছু শিল্প খাতকে ব্যাপকভাবে বদলে দেবে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব হবে সামান্য। এটি কি মিষ্টান্নের মান বাড়াতে পারবে? অথবা ডাক্ট টেপের? কিংবা একটি বাড়ির কাঠামো দাঁড় করাতে পারবে? হয়তো এটি খাদ্য ও টেপ পরিবহন ও সংরক্ষণের লজিস্টিকস আরও সহজ ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে। কিন্তু এর বাইরে এর ক্ষমতা কতটুকু?

জ্ঞানভিত্তিক সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা শুধু দক্ষতাই চান না, তাঁরা জবাবদিহিও চান। কোনো এআই অ্যাপ আপনার করের হিসাব গুলিয়ে ফেললে সেটিকে দায়ী করার চেষ্টা করে দেখুন। তথ্যের গোপনীয়তাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে সাধারণত একটিকে রেখে অন্যটিকে বাদ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় না। স্মার্টফোনভিত্তিক খাবার সরবরাহের অ্যাপ বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তবু মুদিদোকান ও রেস্তোরাঁর বিক্রি বাড়ছেই। বৃহৎ খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রগুলো খুচরা ব্যবসার ধরন বদলে দিয়েছিল, এরপর অনলাইন খুচরা ব্যবসাও তা বদলে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও জমজমাট শপিং সেন্টারের পাশাপাশি অনেক ছোট দোকানও রমরমাভাবে চলছে।

এআই সম্ভবত অনেক কিছু বদলে দেবে, তবে তাতে সময় লাগবে। সময়ের সঙ্গে এটি তরুণ আইনজীবীদের গতানুগতিক কাজ ছেড়ে আরও উৎপাদনশীল কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে। ভবিষ্যতে চালকবিহীন ট্রাক বিশ্বজুড়ে চালকের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। আর একদিন স্বচালিত গাড়ি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষকে এমন স্বাধীনতা দেবে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না।

এআই আর্থিক সেবা পাওয়া সহজ করবে এবং আরও বেশি মানুষের কাছে এসব সেবা পৌঁছে দেবে। কিন্তু এটি কি সবাইকে প্রতিস্থাপন করবে? যে বটকে কোনো ভুলের জন্য দায়ী করা যায় না, তার হাতে সারা জীবনের সঞ্চয় তুলে দিতে কতজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ রাজি হবেন?

বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অ্যাপগুলো কারও পড়ে যাওয়া বা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচকে পরিবর্তন ঘটা শনাক্ত করে কাজ ও বয়স্ক স্বজনের পরিচর্যা সামলাতে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলোকে সহায়তা করে।

দক্ষতা বাড়ানো ভালো বিষয়। কিন্তু শুধু কম কর্মী দিয়ে একই কাজ আরও বেশি করে কোনো যুগান্তকারী কোম্পানি বিশ্বকে বদলে দেয়নি। উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যার এমন নতুন সমাধান খুঁজে বের করে, যা আগে কেউ ভাবেনি। এআইয়ের শক্তি কর্মীসংখ্যা কমানোর মধ্যে নয়, বরং কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে। কারখানা, কল সেন্টারসহ আরও নানা ক্ষেত্রে এটি ইতিমধ্যে মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। এআই শিগগিরই মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রতিস্থাপন করবে না।

বর্তমান ভয় ও আশা—দুটোই মাত্রাতিরিক্ত। বড় পরিবর্তন আসবে, তবে তা এত দ্রুত হবে না। তাই মাথা ঠান্ডা রাখা প্রয়োজন।

— কেন ফিশার, ফিশার ইনভেস্টমেন্টসের প্রতিষ্ঠাতা, নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সহপ্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা