এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের জন্য ডেটা প্রস্তুতের ব্যবসা শুরু করেছিলেন আলেকজান্ডার ওয়াং। পরবর্তীতে তাঁর সেই প্রতিষ্ঠানেই ১৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ৪৯ শতাংশ অংশীদারত্ব গ্রহণ করে মেটা। বর্তমানে এই ২৯ বছর বয়সী উদ্যোক্তা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এআই কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর এই অভাবনীয় উত্থান কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এআই শিল্পে ডেটা, মেধা এবং বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আলোচনা শুরু হলে আমাদের সামনে চ্যাটবট, শক্তিশালী কম্পিউটার কিংবা জটিল অ্যালগরিদমের কথা ভেসে ওঠে। তবে এই প্রযুক্তিগুলোকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে আরেকটি বিষয় অপরিহার্য, আর তা হলো উচ্চমানের ডেটা। তথ্য যদি সঠিকভাবে শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করা না হয়, তবে এআই মডেলকে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

আলেকজান্ডার ওয়াং এই প্রয়োজনীয়তাকেই ব্যবসার এক বিশাল সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) অধ্যয়নরত অবস্থায় বন্ধু লুসি গুওকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'স্কেল এআই'। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ত্যাগ করে তিনি পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

স্কেল এআই-এর মূল লক্ষ্য ছিল এআই মডেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা প্রস্তুত করা। শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি স্বচালিত গাড়ির মতো উন্নত প্রযুক্তির জন্য তথ্য চিহ্নিত ও শ্রেণিবদ্ধ করার কাজ করত। পরবর্তীতে এআই প্রশিক্ষণের উপযোগী ডেটা সরবরাহ এবং মডেলের কার্যকারিতা যাচাইয়ের মতো বিভিন্ন সেবা তাদের তালিকায় যুক্ত হয়।

বিশ্বজুড়ে এআই-এর ব্যবহার যত বৃদ্ধি পেতে থাকে, ততই এই ডেটা প্রস্তুতকরণের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। কারণ, একটি উন্নত মডেল তৈরির জন্য শুধু কম্পিউটিং ক্ষমতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; মডেলটিকে শেখানোর উপযোগী সঠিক তথ্যেরও প্রয়োজন হয়। স্কেল এআই-এর ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল ঠিক এই চাহিদাই।

স্কেল এআই-এর দ্রুত সম্প্রসারণ আলেকজান্ডার ওয়াংকে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত উদ্যোক্তায় পরিণত করে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য বৃদ্ধির পর খুব অল্প বয়সেই তাঁর সম্পদের পরিমাণ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছে যায়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী 'সেলফ–মেড' বা স্বনির্ভর বিলিয়নিয়ার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তবে তাঁর এই সাফল্যের তাৎপর্য কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাপে সীমাবদ্ধ নয়। এআই নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা প্রস্তুত ও মূল্যায়নের মতো কাজের গুরুত্ব এখন স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। এক সময় প্রযুক্তির আড়ালে থাকা এই পর্দার পেছনের কাজই আজ বড় ব্যবসার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালে ওয়াংয়ের পেশাগত জীবনে এক বড় পরিবর্তন আসে। মেটা স্কেল এআই-তে ১৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটির ৪৯ শতাংশ অংশীদারত্ব নেয়। এই চুক্তির সময় স্কেল এআই-এর মোট মূল্যায়ন দাঁড়ায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। এরপর ওয়াং মেটার এআই কার্যক্রমে যোগ দেন এবং প্রতিষ্ঠানটির 'সুপারইন্টেলিজেন্স' উদ্যোগের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মেটার এই পদক্ষেপের পেছনে ছিল এআই প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার একটি কৌশলগত লক্ষ্য। ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত এআই মডেল তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষ গবেষক ও প্রকৌশলীদের একত্রিত করা এবং এআই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

ওয়াংয়ের বর্তমান দায়িত্ব কেবল প্রযুক্তি উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মেটার এআই গবেষণা দল গঠন, দক্ষ কর্মী আকর্ষণ এবং উন্নত মডেল তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

বর্তমান সময়ে এআই-এর দৌড়ে কেবল প্রযুক্তির নয়, বরং প্রতিভার লড়াই চলছে। অভিজ্ঞ গবেষক ও প্রকৌশলীদের নিজেদের দলে টানতে বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। একই সঙ্গে দ্রুত উন্নত মডেল তৈরি, সেগুলোকে বাস্তব কাজে ব্যবহারযোগ্য করা এবং বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে থাকার এক তীব্র চাপ কাজ করছে।

২০২৬ সালে মেটার নতুন এআই মডেল ও 'মিউস' উদ্যোগ নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে ওয়াংয়ের ভূমিকা আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাজে আরও কার্যকর এআই সহকারী তৈরি করা। তবে এ ধরনের প্রযুক্তি কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে মডেলের সক্ষমতার পাশাপাশি বাস্তব ব্যবহার, নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তার ওপর।

তবে ওয়াংয়ের ক্যারিয়ার সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। স্কেল এআই-এর ডেটা সংগ্রহ ও প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান’–এর এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির হয়ে কাজ করা কয়েকজন কর্মী তাঁদের দায়িত্বের ধরন এবং অনলাইনে পাওয়া ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উদ্বেগ জানান। স্কেল এআই এসব কাজের সুযোগ ও কর্মীদের ভূমিকা সম্পর্কে নিজেদের বক্তব্যও দিয়েছে।

এই ধরনের প্রতিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এআই প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহের সঙ্গে শ্রমের পরিবেশ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য ব্যবহারের নৈতিকতার প্রশ্নগুলো গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রযুক্তি যত সামনের দিকে এগোবে, এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা তত বাড়বে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে ওয়াই কম্বিনেটরের একটি অনুষ্ঠানে নিজের ১৮ বছর বয়সী সত্তাকে পরামর্শ দিতে গিয়ে ওয়াং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করা এবং অন্যদের মতামতের ভিড়েও সেই ধারণায় আস্থা রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। এআই-এর মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং সেই সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করা তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।

তবে তাঁর ক্যারিয়ার থেকে এই শিক্ষা নেওয়া ঠিক হবে না যে, সাফল্যের জন্য সবারই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ব্যবসা শুরু করা প্রয়োজন। বরং মূল বিষয়টি হলো পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি সম্পর্কে জানা, বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা।

২০১৬ সালে ওয়াং যে ডেটার প্রয়োজনীয়তাকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন, পরবর্তী সময়ে এআই শিল্পের বিস্তার সেই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২৯ বছর বয়সে এসে তিনি এখন মেটার এআই ভবিষ্যৎ গঠনের প্রতিযোগিতায় সামনের সারিতে অবস্থান করছেন।

তাঁর এই যাত্রা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে আসে—ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে বড় সুযোগ তৈরি হবে কোথায়? কেবল নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে, নাকি সেই প্রযুক্তিকে কার্যকর করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে?