সরকারি আবাসন বরাদ্দ পেয়ে সেখানে নিজে অবস্থান না করে ভাড়া বা সাবলেট দেওয়ার মতো অনিয়মে লিপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার।

গত বৃহস্পতিবার রাতে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ৩১ অক্টোবর, অর্থাৎ শনিবারের মধ্যেই সকল ভাড়াটেকে বাসা থেকে বিদায় করতে হবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন শ্রেণির মোট ১৯ হাজার ৯১টি সরকারি বাসা রয়েছে, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ বসবাস করেন। সরকারি বাসায় অবস্থানকারী চাকরিজীবীদের মাসিক বেতন থেকে বাসাভাড়া ভাতা কেটে নেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এসব বাসার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় সরকারি কলোনিগুলোর খোলামেলা পরিবেশ, খেলার মাঠ এবং উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিপরীতে শহরের বাইরের অনেক এলাকা অত্যন্ত ঘিঞ্জি। তবে অনেক সরকারি চাকরিজীবীর অভিযোগ রয়েছে যে, শুরুতে বাসা বরাদ্দ পাওয়ার জন্য তাঁদের বড় অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়েছে।

তদন্তে জানা গেছে, অনেক সরকারি চাকরিজীবী নিয়মবহির্ভূতভাবে বাসা ভাড়া দিচ্ছেন। কেউ পুরো বাসা ভাড়া দিয়েছেন, আবার কেউ নির্দিষ্ট এক বা দুটি কক্ষ সাবলেট দিয়েছেন। চাকরিজীবীদের সাথে কথা বলে বাসা ভাড়া দেওয়ার তিনটি প্রধান কারণ সামনে এসেছে। প্রথমত, অনেকে কম ভাড়ায় বাইরের কোনো বাসায় থেকে সরকারি বাসাটি ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয় করতে চান। উদাহরণস্বরূপ, আজিমপুর কলোনির বাসাগুলো উচ্চমূল্যে ভাড়া দেওয়া সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, যাদের যথেষ্ট উপরি আয় বা অন্য উৎস থেকে আয় রয়েছে, তারা পুরোনো সরকারি বাসায় থাকতে আগ্রহী নন এবং ভাড়া দিয়ে বাড়তি মুনাফা করতে চান। তৃতীয়ত, অনেকের ক্ষেত্রে বেতনের টাকায় সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে এক বা দুটি কক্ষ ভাড়া দেওয়া শুরু করেন।

ঢাকার একটি সরকারি কলোনির একজন চাকরিজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁর বাসায় দুটি শয়নকক্ষ বা বেডরুম। একটি তিনি ভাড়া দেন আট হাজার টাকায়।” তিনি আরও জানান, “২০২২ সাল থেকে নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। খরচ সামলাতে না পেরে তিনি একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়া শুরু করেন।”

এদিকে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের গণবিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সরকারি বাসা ভাড়া দেওয়া ‘বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালা, ১৯৮২’-এর পরিপন্থী। নিয়ম অনুযায়ী, যে কর্মকর্তা বা কর্মচারী বাসা বরাদ্দ পেয়েছেন, তাকেই সেখানে অবস্থান ও বসবাস করতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কোনো বাসায় সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ওই বাসার বরাদ্দ বাতিল করা হবে। পাশাপাশি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালার বিধি ১৪(৩) অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ প্রাপকের অফিসপ্রধান এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হবে।

তবে বৃহস্পতিবার নোটিশ দিয়ে শনিবারের মধ্যে ভাড়াটে ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “যাঁরা অবৈধভাবে বাসায় থাকছেন তাঁদের তো সময় দেওয়ার কথা নয়। সরকার তাঁদের সময় দেবে কেন?”

এত অল্প সময়ে ভাড়াটেরা নতুন বাসা খুঁজবেন কীভাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে জহিরুল ইসলাম খান বলেন, “এটা তাঁদের বিষয়। তাঁদের তো এক দিনও অবৈধভাবে বাসায় থাকার কথা নয়।” তিনি আরও জানান, সরকারি ভাষায় অবৈধভাবে বসবাস ঠেকাতে সরকার এবার কঠোর হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি “সিরিয়াসলি” দেখার কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, অনেক দিন ধরেই ভাড়াটে বিদায় করতে মৌখিকভাবে বলা হচ্ছে।

অন্যদিকে, কয়েকজন সরকারি চাকরিজীবী দাবি করেছেন যে, তাঁরা কোনো নোটিশ পাননি এবং গতকালই আবাসন পরিদপ্তরের এই কঠোর অবস্থানের কথা জানতে পেরেছেন। তাঁদের মতে, মাত্র একদিনের নোটিশে ভাড়াটেকে বাসা ছাড়ানো প্রায় অসম্ভব। একজন সরকারি চাকরিজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আবাসন পরিদপ্তর স্বল্প সময়ের নোটিশ নিয়ে একটি বাণিজ্যের আয়োজন করেছে। এখন তারা বাসায় বাসায় যাবে। বরাদ্দ বাতিলের নোটিশ দেবে। তারপর টাকা দিয়ে বাসা রক্ষা করতে হবে।”

তবে অনেক সচেতন ব্যক্তি মনে করেন, সরকারি বাসা ভাড়া দেওয়ার এই অনিয়ম দূর করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বাকি অংশ বাস্তবায়নের পথে। ফলে এখন থেকে সরকারি বাসা ভাড়া না দিয়েও জীবনযাপন করা সম্ভব হবে।

সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সরকারি বাসা ভাড়া দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেই আইন প্রয়োগে আবাসন পরিদপ্তর এত দিন কী করেছে। এই সামান্য বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কেন লাগবে।” তিনি মনে করেন, ভাড়াটে বিদায় করার জন্য অন্তত তিন থেকে পাঁচ দিন সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল।