নবম জাতীয় বেতনকাঠামো বা পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আগামী অক্টোবরের বেতনের সাথে প্রায় তিন মাসের বকেয়া বা অ্যারিয়ার পেতে পারেন। তবে কোন গ্রেডের কর্মচারী ঠিক কত টাকা পাবেন, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশনের প্রক্রিয়ার ওপর।
আগামীকাল সোমবার (৫ অক্টোবর) থেকে এই কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ আগামী ২০ অক্টোবরের মধ্যে এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, নতুন বেতন নির্ধারণের কাজ সম্পন্ন হবে আইবাস প্লাস প্লাসের পে ফিক্সেশন মডিউলের মাধ্যমে। নির্ধারিত এই পোর্টালে প্রবেশ করে চাকরিজীবীদের তাদের চাকরি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করতে হবে।
চাকরিজীবীদের প্রথমেই নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, জন্মতারিখ, বর্তমান পদ ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং বর্তমান মূল বেতনের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি আগের বেতন নির্ধারণের তথ্যের সাথে বর্তমান তথ্যের সামঞ্জস্য মিলিয়ে দেখতে হবে।
নতুন স্কেলে প্রত্যেক চাকরিজীবীর মূল বেতন পে ফিক্সেশনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বর্তমান ও আগের মূল বেতনের ব্যবধান এবং বেতন কার্যকর হওয়ার তারিখ বিবেচনা করে বকেয়ার মোট পরিমাণ হিসাব করা হবে।
অর্থ বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রায় তিন মাসের বকেয়া অর্থ একসঙ্গে পরিশোধ করা হবে। তবে সবার বকেয়ার পরিমাণ সমান হবে না। এটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত বেতন এবং বেতন কার্যকর হওয়ার তারিখের ওপর।
পে ফিক্সেশনের সময় পদোন্নতি, বদলি, টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য প্রদান করা বাধ্যতামূলক।
এই সব তথ্যের স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় অফিস আদেশ ও নথিপত্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তথ্যে ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া আইবাস প্লাস প্লাসে নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বর প্রয়োজন হবে। যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তারা চাকরির নথিতে থাকা জন্মতারিখসহ অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করে আবেদন করতে পারবেন।
নতুন বেতনকাঠামো যেভাবে কার্যকর হবে
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এই নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন বেতন ও ভাতা কার্যকর হবে। প্রথম ধাপে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত এবং তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। অন্যদিকে, ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যে মূল বেতন ছিল, সেটিকে ভিত্তি ধরে নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে। নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রদান করা হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ওই পার্থক্যের ৭০ শতাংশ দেওয়া হবে। সবশেষে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে দুই দফায় মূল বেতনের ৭০ শতাংশ প্রদানের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তথ্য যাচাই করবে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়
চাকরিজীবীরা অনলাইনে তথ্য প্রদানের পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় তা যাচাই করবে। তথ্য ও নথিপত্রের মধ্যে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করতে হবে। শুধুমাত্র অনলাইনে তথ্য পূরণ করলেই প্রক্রিয়া শেষ হবে না; আগের চাকরির ইতিহাস ও বেতন নির্ধারণের তথ্যের সাথে নতুন তথ্যের মিল থাকা আবশ্যক।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, অনলাইনে তথ্য প্রদানে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার সহায়তা নেওয়া যাবে। বেতন নির্ধারণ চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন বিল তৈরি হবে এবং একই সাথে বকেয়া পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করা হবে।
বেতন নির্ধারণের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ‘সেবা দেওয়া সক্ষম করতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচি’র (এসপিএফএমএস) আওতায় আইবাস প্লাস প্লাসে প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (সিএএফও), বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক (ডিসিএ), জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (ডিএএফও) এবং উপজেলা হিসাব কর্মকর্তা (ইউএও) কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন।
নতুন হিসাব থাকছে উচ্চতর গ্রেডে
নতুন বেতন আদেশ অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়াই একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং তার চাকরি সন্তোষজনক হলে তিনি পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাবেন। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
তবে আগের বেতনকাঠামোয় যারা টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা এই সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছেন।
আদেশ অনুযায়ী, আগের বেতনকাঠামোয় একই পদে দুই বা ততোধিক সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন কাঠামোয় ওই পদে আর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একই পদে কোনো কর্মচারী মাত্র একটি উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পেয়ে থাকলে, পরবর্তী ছয় বছর পূর্তির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, ৫ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর্তমান বেতনের পাশাপাশি আগের পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং বেতন নির্ধারণের ইতিহাস সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে। এই তথ্যগুলো সঠিক থাকলেই নতুন বেতন ও বকেয়া পাওনার হিসাব নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হবে।