মিরপুর টেস্টের তিন দিন শেষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের হাতের মুঠোয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৭৯ রান তুলতেই ৬ উইকেট হারিয়ে চরম সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। হাতে মাত্র চার উইকেট বাকি থাকা অবস্থায় স্বাগতিকদের বর্তমান লিড ১০৬ রান। তবে এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও জয়ের আশা ছাড়ছেন না নাঈম হাসান। বাংলাদেশের এই অফ স্পিনারের লক্ষ্য হলো অন্তত ২০০ রানের লিড নেওয়া। অন্যদিকে, ক্যারিবীয়দের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের বাকি চার উইকেট দ্রুত তুলে নিয়ে লক্ষ্য যত রানই হোক না কেন, তা তাড়া করে জিততে চান ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং কোচ ফ্লয়েড রেইফার।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে দুই দলের প্রতিনিধিরা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়েও বড় জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন নাঈম। বিপরীতে, ঘূর্ণি উইকেটেও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করার পরিকল্পনা সাজিয়েছেন রেইফার।

তৃতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের সংগ্রহ ৬ উইকেটে ৭৯ রান। প্রথম ইনিংসে পাওয়া ২৭ রানের লিড মিলিয়ে বর্তমানে স্বাগতিকরা এগিয়ে আছে ১০৬ রানে। আলোকস্বল্পতার কারণে দিনের খেলা বন্ধ হওয়ার সময় জাকের আলী ও নাঈম হাসান দুজনই ১৮ রানে অপরাজিত ছিলেন। সপ্তম উইকেটে তাদের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে এসেছে ২৬ রান।

বর্তমান পরিস্থিতিতে চতুর্থ দিনের শুরুতে এই জুটির ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভাগ্য। অন্তত ২০০ রানের লিড পেতে হলে স্বাগতিকদের আরও ৯৪ রান করতে হবে। এই লক্ষ্যটি কঠিন হলেও অসম্ভব মনে করছেন না নাঈম।

দিনের খেলা শেষে তিনি বলেন, “আমরা যত বেশি সম্ভব রান করার চেষ্টা করব। আল্লাহর রহমতে জাকের ভাই আর আমি এখন ব্যাটিং করছি। আমরা যদি দীর্ঘ সময় ব্যাট করতে পারি, তাহলে দলের জন্য ভালো হবে। ২০০ রানের লিড হলেও খুব ভালো হবে। তবে আমরা আরও বেশি রান করার চেষ্টা করব।”

মিরপুরের এই উইকেটে স্পিনাররা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। বল কখনো দ্রুত ঘুরছে, আবার কখনো নিচু হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল উইকেট বাঁচিয়ে খেলার পরিবর্তে রান করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন নাঈম।

নিজের ব্যাটিং পরিকল্পনা সম্পর্কে এই অফ স্পিনার বলেন, “আমি যখন ব্যাটিংয়ে নামি, তখন নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বল বুঝে খেলার চেষ্টা করেছি। এই উইকেটে রান করার চেষ্টা করতে হবে, কারণ বল ঘুরছে। রান করতে থাকলে বোলাররাও চাপে পড়বে।”

প্রথম ইনিংসে বল হাতে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা পারফরমার ছিলেন নাঈম। তার ৩৩ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার সুবাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২৪৫ রানে অলআউট করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। ফলে প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড পায় স্বাগতিকরা।

তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে সেই সুবিধা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। মাত্র ৩৫ রানের মধ্যে প্রথম পাঁচ ব্যাটারকে হারানোর পর ৫৩ রানে পড়ে ষষ্ঠ উইকেটও। ক্যারিবীয় অধিনায়ক রোস্টন চেজ ২৫ রানে ৩ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান। বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান নেন আরও দুটি উইকেট।

নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন নাঈম। তাঁর মতে, ফ্লাডলাইটের আলোয় ব্যাটিং করার সময় বলের আচরণ কিছুটা বদলে যাচ্ছিল। তবে পরিস্থিতি কঠিন হলেও বাংলাদেশের ব্যাটারদের আরও ভালো করা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।

নাঈম বলেন, “শান্ত ভাইরা যখন ব্যাটিং করছিলেন, তখন ফ্লাডলাইটের আলোয় খেলা হচ্ছিল। বল কখনো সোজা আসছিল, আবার কখনো ঘুরছিল। ওই পরিস্থিতিতে আমাদের হয়তো আরেকটু ভালো ব্যাটিং করা দরকার ছিল। তবে এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”

বাংলাদেশের এমন বিপর্যয়ে স্বাভাবিকভাবেই আত্মবিশ্বাসী ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে ক্যারিবীয় ব্যাটিং কোচ ফ্লয়েড রেইফার জানেন, মিরপুরের উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিং করা সহজ হবে না। তাই রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করতে চান না তিনি।

রেইফার বলেন, “এই ধরনের উইকেটে শুধু টিকে থাকার জন্য ব্যাটিং করা যায় না। কারণ একটি বল ঘুরবে, অন্যটি নিচু হয়ে আসবে। তাই ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে রান করার সুযোগ খুঁজতে হবে। সেটি করতে পারলে রান করার ভালো অবস্থানে থাকা সম্ভব।”

বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণ মোকাবিলার জন্য নিজেদের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন ক্যারিবীয় কোচ। তাঁর দাবি, বাংলাদেশ সফরের আগে চেন্নাইয়ে দুই সপ্তাহের ক্যাম্পে স্পিন বোলিংয়ের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাটিংয়ের অনুশীলন করেছেন তাঁরা। সেই প্রস্তুতি কাজে লাগিয়ে মিরপুরের কঠিন উইকেটেও রান তুলতে চান তিনি।

রেইফার বলেন, “চেন্নাইয়ে আমরা দুই সপ্তাহ অনুশীলন করেছি। সেখানে স্পিন বোলিংয়ের বিপক্ষে অনেক ব্যাটিং করেছি। আমাদের ব্যাটাররা এখন স্পিনের বিপক্ষে আগের চেয়ে ভালো। কাল বাংলাদেশ আমাদের যত রানের লক্ষ্যই দিক, আমরা সেটি তাড়া করে জেতার চেষ্টা করব।”

তবে লক্ষ্য তাড়া করার আগে বাংলাদেশের বাকি চার উইকেট দ্রুত তুলে নেওয়াই ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে চতুর্থ দিনের প্রথম ঘণ্টাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন রেইফার।

ক্যারিবীয় কোচ বলেন, “বাংলাদেশ এখন ৭৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়েছে। কাল শুরুতেই আমরা বাকি ব্যাটারদের দ্রুত ফেরানোর চেষ্টা করব। প্রথম ঘণ্টাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই জুটি ভাঙতে পারলে বাকি কাজ শেষ করার সুযোগ থাকবে।”

রেইফারের মতে, লক্ষ্য ১২৫ রানের আশপাশে রাখা গেলে এই উইকেটেও জয় পাওয়া সম্ভব। তবে সেটি নিশ্চিত করতে আগে জাকের ও নাঈমের প্রতিরোধ ভাঙতে হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে।

সব মিলিয়ে মিরপুর টেস্টের চতুর্থ দিন শুরু হবে দুই দলের বিপরীত লক্ষ্য নিয়ে। বাংলাদেশ চাইছে আরও অন্তত ৯৪ রান যোগ করে লিড ২০০-তে নিতে। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ চাইছে দ্রুত ইনিংস গুটিয়ে ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে।

তিন দিন শেষে ম্যাচের পরিস্থিতি ক্যারিবীয়দের পক্ষে থাকলেও স্পিন সহায়ক উইকেটে এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে চতুর্থ দিনের শুরুতে জাকের-নাঈম জুটিকে বড় করতে হবে। অন্যদিকে এই জুটি যত দ্রুত ভাঙতে পারবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জয়ের পথ ততটাই সহজ হবে সফরকারীদের জন্য।