আলোকস্বল্পতার কবলে পড়ে আরও একটি দিন অসম্পূর্ণভাবে শেষ হলো মিরপুর টেস্টের। তৃতীয় দিনেও নির্ধারিত সময়ের পুরোটা খেলা সম্ভব হয়নি। প্রথম তিন দিনে মোট ২৭০ ওভার খেলার কথা থাকলেও, প্রতিদিন শেষ দিকে আলো কমে যাওয়ায় সব মিলিয়ে খেলা হতে পেরেছে মাত্র ২০৯.৩ ওভার। অর্থাৎ, তিন দিনের হিসেবে প্রায় ৬০ ওভার খেলা কম হয়েছে।
তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও মিরপুর টেস্টের ফলাফল খুব শীঘ্রই নির্ধারিত হবে বলে মনে হচ্ছে। তিন দিনে ২০৯.৩ ওভারের মধ্যেই ঝরে পড়েছে ২৬টি উইকেট। সামনে আরও দুই দিন বাকি। আলোর স্বল্পতার কারণে এই দিনগুলোতেও খেলা আগেভাগে শেষ হয়ে গেলেও ফলাফল মোটামুটি অনিবার্য। কেবল ঝড়-বৃষ্টির কারণে খেলা ভেসে না গেলেই চলবে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই লড়াইয়ে শেষ হাসি ফুটবে কার? তৃতীয় দিনের শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি দেখে অনেকের মনে হতে পারে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে আলোকস্বল্পতার কারণে ৬ উইকেটে ৭৯ রান নিয়ে দিন শেষ করা বাংলাদেশ বর্তমানে ১০৬ রানের লিডে রয়েছে। বাকি ব্যাটসম্যানেরা যদি এই লিডকে একটি নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন, তবে বোলারদের জন্য শেষ চেষ্টা করার সুযোগ তৈরি হবে। দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে নাঈম হাসান তাঁদের প্রত্যাশিত লিডের কথা উল্লেখ করে বলেন, “২০০ রান”। যদিও দলের স্বীকৃত ব্যাটসম্যান এখন আর তেমন নেই। দিন শেষে উইকেটে টিকে ছিলেন জাকের আলী ও নাঈম হাসান।
তবে শুরু থেকেই একের পর এক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে বাংলাদেশকে। চোটের কারণে মুশফিকুর রহিম পুরো ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছেন। লিটন দাস চোট থাকা সত্ত্বেও মাঠে নামলেও কনুইয়ে পুনরায় আঘাত পান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, উইকেটের পেছনে মাঝে মাঝে জাকেরকে ডেকে পাঠাতে হয়। এর মধ্যেই সিলি পয়েন্টে ফিল্ডিং করতে গিয়ে মুমিনুলের মাথায় আঘাত লাগে। তাঁর কনকাশন সাব হিসেবেই ব্যাটিং করতে নামেন জাকের।
বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের পেছনে এই শারীরিক অসুস্থতা ও চোটের প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে এই যুক্তি আসতে পারে যে, ম্যাচের আগে এবং চলাকালীন এভাবে চোট-আঘাতে জর্জরিত হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
তবে বাস্তব সত্য এটাই যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশ তাদের সেরাটা দিতে পারছে না। বোলারদের সাফল্যকে ম্লান করে দিয়েছে ব্যাটসম্যানদের চরম ব্যর্থতা। প্রথম ইনিংসে ২৭ রানে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট হারিয়ে তৃতীয় দিন শেষ হওয়ার আগে ১০৬ রানের লিড নিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, চতুর্থ দিনে এই টেস্ট শেষ হয়ে গেলেও তা অস্বাভাবিক মনে হবে না।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস ২৪৫ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর চা-বিরতির আগেই ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। কিন্তু শুরু থেকেই বিপর্যয়! মাত্র ৩৩ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ, যার ফলে চা-বিরতিতে স্কোর দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৩৪ রান। শেষ সেশনের প্রথম ওভারেই জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে এলবিডব্লু হয়ে যান লিটন দাস। এরপর দলকে ৫৩ রানে রেখে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে মিরাজও বোল্ড হন প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়া বাঁহাতি স্পিনার ওয়ারিক্যানের বলে। বাংলাদেশের স্কোর ৬ উইকেটে ৭৯ রানে পৌঁছালে আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট। এরপর আর খেলা সম্ভব হয়নি।
মিরপুরের উইকেটে প্রথম দিন থেকেই স্পিনাররা সুবিধা পাচ্ছেন, যা তৃতীয় দিনে আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে বলগুলো খেলার অনুপযুক্ত ছিল না; বিশাল কোনো টার্ন বা বাউন্সের কারণেও উইকেট পড়েনি। মিরপুরের উইকেটে তৃতীয় দিনে যতটুকু টার্ন পাওয়া যায়, তা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের খুব ভালোভাবে জানা ছিল।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, উইকেটে গিয়ে জানা বিষয়গুলোই অনেক সময় ভুল হয়ে যায়, যা বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের একটি নিয়মিত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও ব্যাটসম্যানরা প্রায় সবাই উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন। ওপেনার সাদমান ইসলাম থেকে শুরু করে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান মিরাজ—কেউই খুব কঠিন বা অসাধারণ কোনো বলে আউট হননি।
তাওহিদ হৃদয়ের আউট হওয়ার ধরনটি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। প্রথম ইনিংসে ৪২ রান করার পর তিনি তেড়ে মারতে গিয়ে আউট হয়েছিলেন। আজ কোনো রান না করেই প্রায় একই ধরনের শট খেলে মিড অনে জেইডেন সিলসের হাতে ক্যাচ দিলেন তিনি।
১১তম ওভারের প্রথম বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রোস্টন চেজ সাদমানকে বোল্ড করেন এবং চতুর্থ বলে হৃদয়কে ফেরান। অর্থাৎ, মাত্র দুই বলের ব্যবধানেই হৃদয়ের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। বড় শট খেলে চেজকে চাপে ফেলার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি উল্টো নিজের দলকেই চাপে ফেলে দেন।
এর আগে দ্বিতীয় দিনে ৪ উইকেটে ১৩৪ রানের সাথে বাকি ৬ উইকেটে আরও ১১১ রান যোগ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস শেষ হয়। দিনের শুরুটা তাদের জন্য মন্দ ছিল না, লাঞ্চের আগে তারা মাত্র ২ উইকেট হারিয়েছিল। কিন্তু লাঞ্চের পর মাত্র ৩২ রান তুলতেই তারা অলআউট হয়ে যায়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিংয়ের সময় বল মাঝে মাঝে নিচু হচ্ছিল এবং বেশ টার্ন নিচ্ছিল। জশুয়া বিশপকে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলা মিরাজের বলটি ছিল ঠিক তেমনই। তেজনারায়ণ চন্দরপলের ফিফটির (৫৬) পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল পঞ্চম উইকেটে জাস্টিন গ্রিভস ও রোস্টন চেজের ৫১ রানের জুটি। তবে নাঈম হাসানের বলে গ্রিভসের এলবিডব্লু হওয়ার পর সেই জুটি ভেঙে যায় এবং শুরু হয় বিপর্যয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ ৫ উইকেট পড়ে মাত্র ৩২ রানে, যার মধ্যে শেষ ৪ উইকেট পড়ে মাত্র ১১ রানে। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার নাঈম, যিনি ৩৩ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন। তিনি শামার জোসেফ এবং ওয়ারিক্যানকে একই ওভারে ফিরিয়েছেন।
আগামীকাল জাকেরের সঙ্গে মিলে ব্যাট হাতে দিন শুরু করবেন নাঈম। তবে শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচটি বাংলাদেশের অনুকূলে যায় কি না, তা জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
স্কোরবোর্ড:
বাংলাদেশ: ২৭২ ও ২৯ ওভারে ৭৯/৬ (জাকের ১৮*, নাঈম ১৮*, সাদমান ১৩; চেজ ৩/২৫, ওয়ারিক্যান ২/১৯)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস: ৮২.৫ ওভারে ২৪৫ (চন্দরপল ৫৬, ক্যাম্পবেল ৫৪, গ্রিভস ৪৬, চেজ ৪৩*; নাঈম ৪/৩৩, মিরাজ ২/৬৫, তাইজুল ২/৭৬)।