কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী এলাকায় গভীর নলকূপ খননের সময় মাটির নিচ থেকে হঠাৎ গ্যাসের আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। চার দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখনো সেই আগুন নেভেনি। আগুনের দৃশ্য দেখতে আজ শুক্রবারও ঘটনাস্থলে শত শত মানুষের ভিড় জমেছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগুনের উৎসের আশপাশের ২০০ মিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তারের স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই ১৪৪ ধারা জারির কথা জানানো হয়েছে। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
আদেশে আরও বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আগুনের উৎস এবং এর আশপাশের এলাকাকে বিভিন্ন নিরাপত্তা জোনে বিভক্ত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ অবস্থায় ঘটনাস্থল ও আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দেশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে—এমন সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে। ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় একটি নলকূপ খননের সময় হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। বর্তমানে আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে মোতায়েন রয়েছে। তবে লোকজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয়দের বাগ্বিতণ্ডা ও তর্কাতর্কির ঘটনাও ঘটেছে।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আগুনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে রয়েছে। আজ বাপেক্সের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন।”
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে নলকূপে আগুন জ্বললেও বিকেল পাঁচটার পর থেকে এর তীব্রতা বাড়তে থাকে। আজ শুক্রবার বেলা তিনটা পর্যন্ত আগুনের তীব্রতা অব্যাহত ছিল। এর আগে বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা। স্থানীয় লোকজনও আগুন নেভানোর কাজে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বলেন, “বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের নির্দেশনা হচ্ছে মাটির নিচের গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে।”
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুর আরহাম বলেন, “নলকূপের গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে। মাটির নিচের স্তরের গ্যাস শেষ হয়ে গেলে আগুন নিভে যাবে। জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হলে মাটির নিচে আগুন অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বড় বিপদ হতে পারে। তাই গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হচ্ছে।”
আগুনের তীব্রতার কারণে মেরিন ড্রাইভের অন্তত ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় শুরু হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। ১৪৪ ধারার আওতায় থাকা মেরিন ড্রাইভ থেকে উখিয়ার ইনানী ও কোটবাজারে যাতায়াতের দুটি প্রধান সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং সড়কে কাঁটাতার টেনে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স উখিয়ার স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, “গ্যাসের আগুন বৈদ্যুতিক খুঁটির তারে লেগে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এ কারণে ঘটনার দিন থেকে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মনখালী-পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এতে অন্তত ৯ হাজার গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েন। বৃহস্পতিবার রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।”