কক্সবাজার জেলার উখিয়ার ইনানী এলাকায় একটি গভীর নলকূপ খননস্থল থেকে নির্গত গ্যাসে সৃষ্ট আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত মঙ্গলবার ভোরে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। চার দিন অতিবাহিত হওয়ার পর শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালেও আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলতে দেখা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
আগুন দেখার কৌতূহলে ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে প্রশাসন। ১৪৪ ধারা জারির ফলে ওই নির্দিষ্ট এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল এবং জমায়েত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভস্থ কোনো গ্যাসের আধার থেকে উচ্চচাপে এই গ্যাস নির্গত হচ্ছে। তবে গ্যাসের প্রকৃত প্রকৃতি এবং এর উৎস নিশ্চিত হতে হলে নমুনা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সাত দিন সময় চেয়েছে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ প্রায় ১৫ দিন আগে উক্ত স্থানে নলকূপ খননের কাজ শুরু করেছিলেন। গত মঙ্গলবার ভোরে খননস্থল থেকে হঠাৎ গ্যাসের নির্গমন শুরু হয়। পরবর্তীতে বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে এসে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এরপর থেকে অবিরামভাবে গ্যাস নির্গত হচ্ছে এবং আগুন জ্বলছে।
গত মঙ্গলবার রাতে জরুরি ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বাপেক্সের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। এরপর বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলনেতা এসএম নাফিকুন আরহামের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দলটি পুনরায় সেখানে যান। তারা আশপাশের পাহাড়ি এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি মাটি, পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করেন।
এস এম নাফিকুন আরহাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে পাথর ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে গ্যাস নির্গমন শুধু নলকূপ খননের স্থানেই সীমাবদ্ধ নেই। আশপাশের বিভিন্ন স্থান দিয়েও গ্যাস বের হচ্ছে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, “প্রায় এক হাজার ফুট গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। তবে খননের সময় এভাবে গ্যাসের উপস্থিতি বোঝা যায়নি। মঙ্গলবার ভোর থেকে গ্যাসের অস্তিত্ব অনুভূত হয় এবং পরে তা আগুনের শিখা আকারে জ্বলতে শুরু করে। ভূগর্ভস্থ গ্যাসের আধার থেকে এ গ্যাস বের হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।”
গ্যাসের উপাদান সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, “প্রাকৃতিক গ্যাসে সাধারণত মিথেনের পাশাপাশি ইথেন, প্রোপেন, বিউটেন ও পেন্টেনের মতো হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে। তবে এখানকার গ্যাসের সঠিক উপাদান পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।” আগুনের রং এবং ধোঁয়ার ধরন দেখে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। তবে এটি নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানান এস এম নাফিকুন আরহাম।
আগুন নেভানোর প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে এসএম নাফিকুন আরহাম বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্যাস জ্বলতে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ‘রিলিফ ওয়েল’ খনন করে ভূগর্ভে সিমেন্ট পাম্পের মাধ্যমে গ্যাসের প্রবাহ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।”
বাপেক্সের এই কর্মকর্তা আরও জানান, তারা আগামী সাত দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং এরপর সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।