কক্সবাজারের উখিয়ায় একটি গভীর নলকূপ খননের সময় মাটির নিচ থেকে হঠাৎ গ্যাসের নিঃসরণ শুরু হলে সেখানে আগুন ধরেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দলের মতে, মাটির নিচে থাকা গ্যাসের মজুত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই আগুন জ্বলতে দিতে হবে। কারণ বর্তমানে আগুন নেভানোর অন্য কোনো কার্যকর উপায় নেই। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হলে গ্যাস অন্য কোনো পথ ধরে বেরিয়ে আসতে পারে, যা আরও বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ঘটনাটি ঘটে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে। ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় নলকূপ খননের সময় আগুনের সূত্রপাত হয়। আজ বুধবার বেলা তিনটা পর্যন্ত এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বিকেল পাঁচটার পর থেকে আগুনের তীব্রতা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং আজ বুধবারও সেই পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ বালু এবং পানি ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়েছিল। এই প্রচেষ্টায় স্থানীয় বাসিন্দারাও সহায়তা করেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এখন আগুন নেভানোর সব ধরনের চেষ্টা বন্ধ রাখা হয়েছে।
আজ দুপুর ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়, বাপেক্স, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা নিরাপদ দূরত্ব থেকে আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। পুলিশ সদস্যরা সেখানে ভিড় জমানো সাধারণ মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাসের প্রভাবে আগুনের শিখা দুলছিল। আগুনের এই দৃশ্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ সেখানে ভিড় করছেন, যাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁদের কিছু কথা কাটাকাটি ও বিতণ্ডাও হয়েছে।
বেলা আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আগুনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। বাপেক্স ও ফায়ার সার্ভিসের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, মাটির নিচের গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে। গ্যাস অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে গেলে বড় বিপদ হতে পারে।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুর আরহাম বলেন, “নলকূপের গ্যাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে। মাটির নিচের স্তরে গ্যাসের মজুত শেষ হলে আগুন নিভে যাবে। জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে মাটির নিচে আগুন অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ঝুঁকি এড়াতে আগুনের আশপাশে ২০০ থেকে ২৫০ বর্গমিটার এলাকা বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ওই এলাকায় লোকবসতি ও জনসমাগম করা যাবে না। আগুন নিভে যাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী আগুন অন্তত চার থেকে পাঁচ দিন জ্বলতে পারে। তাঁরা লক্ষ্য করেছেন যে, আগের চেয়ে আগুনের তীব্রতা বাড়ছে এবং যে নলকূপের মুখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছে, সেটিও ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছে। এদিকে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত এবং বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ডের কারণে মেরিন ড্রাইভের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে ৪৫টির বেশি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। এছাড়া মেরিন ড্রাইভ থেকে উখিয়ার ইনানী ও কোটবাজারে যাতায়াতের সড়কে যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, এসআরবি এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উখিয়া স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীর ছোট ব্রিজ সংলগ্ন একটি বসতভিটায় নলকূপ খননের সময় স্বয়ংক্রিয় বিস্ফোরণের ফলে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও সফল হয়নি, যার ফলে মঙ্গলবার বেলা তিনটা থেকে সেই তৎপরতা বন্ধ রাখা হয়। এখন বাপেক্সের নির্দেশনা অনুযায়ী, মাটির নিচের গ্যাসের মজুত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দিতে হবে।
উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) কায়সার নূর বলেন, “আগুন বৈদ্যুতিক খুঁটির তারে লেগে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।”