কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী এলাকায় একটি গভীর নলকূপ খননের গর্ত থেকে নির্গত গ্যাসে সৃষ্ট আগুন এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) একটি প্রতিনিধিদল সতর্ক করে জানিয়েছে যে, গ্যাসের প্রবাহ জোরপূর্বক বন্ধ করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৬টার দিকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত সেখানে আগুন জ্বলছিল বলে জানা গেছে।

নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, বিকল্প লাইনের মাধ্যমে বুধবার বিকেল ৫টার মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করার আশা করা হচ্ছে, যার ফলে প্রায় চার হাজার গ্রাহক পুনরায় বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।

মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বাপেক্সের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। তাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, ভূগর্ভের উচ্চচাপের গ্যাস কোনো ফাটল বা দুর্বল স্তরের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসছে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিকুন আরহাম মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বলেন, “আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার ধরন দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে। তবে গ্যাসের প্রকৃত উপাদান ও বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করতে হবে।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর উচ্চচাপের গ্যাস বিভিন্ন ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। পরে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে গ্যাসে আগুন ধরে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।”

গ্যাসের চাপের ঝুঁকি সম্পর্কে এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, “গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় জোর করে প্রবাহ বন্ধ করতে গেলে অন্য কোনো ফাটল দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আপাতত মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের মাত্রা বিশ্লেষণ না করে আগুন কত দিন জ্বলবে, তা বলা সম্ভব নয়।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীতে ছোট ব্রিজ সংলগ্ন মো. আবদুল্লাহর বাড়ির আঙিনায় প্রায় ১০ দিন আগে গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ শুরু হয়। প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করার পর পানি না পাওয়ায় তিন দিন আগে খননকাজ অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর মঙ্গলবার ভোরে পূর্বের খনন করা স্থান থেকে হঠাৎ গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে তাতে আগুন ধরে যায়।

বাড়ির মালিক মো. আবদুল্লাহ জানান, “মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে আগের খনন করা স্থান থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হয়ে আগুন জ্বলে ওঠে। শ্রমিকরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।”

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। পানি ও বালি ব্যবহার করা হলেও ভূগর্ভ থেকে ক্রমাগত গ্যাস নির্গত হওয়ার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, “পাইপলাইনের গ্যাস হলে ভালভ বন্ধ করে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখানে ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে আগুন নেভানো যাচ্ছে না।”

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এখন প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, “৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের নিচে আগুন জ্বলতে থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ২০০ থেকে ২৫০ মিটারের মধ্যে জনসমাগম না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ওই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে কি না তা যাচাই করতে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলকে ডাকা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উখিয়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার কাইজার নুর জানান, মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “বাপেক্সের কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিকল্প লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে বিকল্প লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। বিকেল ৫টার মধ্যে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশা করা হচ্ছে। এতে প্রায় চার হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।”