রাজধানীর সড়কে যাত্রীপরিবহনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশা চলাচলের জন্য একটি নতুন নীতিমালা জারি করেছে সরকার। এই নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, এখন থেকে লাইসেন্স ছাড়া ঢাকা শহরের রাস্তায় কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে পারবে না।

গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এই নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে। নীতিমালায় বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, ই-রিকশা নিবন্ধনের জন্য আগ্রহী ব্যক্তিকে নির্ধারিত ফি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট ফরম অনুযায়ী আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

আবেদন করার পর কর্তৃপক্ষ প্রাপ্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করবে। যদি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়, তবে আবেদনের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করা হবে। এই নিবন্ধনের মেয়াদ হবে মোট পাঁচ বছর।

নিবন্ধিত প্রতিটি ই-রিকশার জন্য কর্তৃপক্ষ একটি কিউআর কোডযুক্ত ইউনিক নিবন্ধন নম্বর এবং নম্বর প্লেট প্রদান করবে। নিয়ম অনুযায়ী, এই কিউআর কোডযুক্ত নিবন্ধন নম্বরটি ই-রিকশার এমন স্থানে প্রদর্শন করতে হবে যেন তা সহজেই দৃশ্যমান হয়।

যদি আবেদন যাচাই-বাছাই করে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট না হয়, তবে আবেদনটি নামঞ্জুর করা হবে। আবেদন নামঞ্জুর করার কারণ সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে আবেদনকারীকে জানাতে হবে।

আবেদন নামঞ্জুর হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন। তবে আপিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে যেকোনো এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।

বুয়েট নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া কোনো ই-রিকশার নিবন্ধন হবে না এবং নবায়নও করা যাবে না।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ক্ষমতাবলে সরকার এই বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’। এই বিধিমালা দেশের সকল সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাকে বিমার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ই-রিকশার ‘ইকোনমিক লাইফটাইম’ হবে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। এই নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে নম্বর প্লেটসহ সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন বাতিল করা হবে।

প্রতিটি ই-রিকশায় বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্পিডোমিটার’ বা ‘ওডোমিটার’ স্থাপন করতে হবে। ত্রুটিযুক্ত ও অবৈধ যানবাহনের চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো যান্ত্রিক বা নিরাপত্তা ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন অবৈধ ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।

মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে অবৈধ ই-রিকশা চলাচল বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন।

ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডর এবং প্রশাসন কর্তৃক সময়-সময় নিষেধাজ্ঞা আরোপিত সড়কে চলাচল করতে পারবে না।

এছাড়া ই-রিকশা ফুটপাতে চলাচল করা নিষিদ্ধ। ই-রিকশাচালকদের সব সময় সড়কের বাঁ লেন অনুসরণ করে চলতে হবে। ড্রাইভিং করার সময় ই-রিকশাচালকরা মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারবেন না এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং বা লেন পরিবর্তন করতে পারবেন না।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, ই-রিকশায় চালক ছাড়া আকারভেদে দুই বা চারজনের বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা নিষিদ্ধ।

ই-রিকশায় ৪০ ডেসিবেলের অধিক তীব্রতার হর্ন ব্যবহার করা যাবে না। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় বা জনবহুল স্থানে ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি হবে প্রতি ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।

ই-রিকশা চলাচলের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট বা চলাচলের সড়ক নির্ধারণ করে দেবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় রুট হবে জোনভিত্তিক এবং এক জোনের ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রতিটি ওয়ার্ডে বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত এবং সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজে ই-রিকশা ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যাবে। সংশ্লিষ্ট চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধিতে উদ্যোগ গ্রহণ ও উৎসাহিত করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মবহির্ভূত চার্জিং পরিহার করতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ করলে বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় দণ্ড প্রদান করা হবে।