মানবসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, যার ফলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন।
একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কেবল রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। একজন মুমিনের জন্য সড়ক নিরাপদ রাখতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে।
রাস্তা হলো সর্বসাধারণের ব্যবহারের স্থান। ইসলামে রাস্তার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট অধিকার বা ‘হক’ নির্ধারণ করা হয়েছে। অকারণে রাস্তায় জটলা করা, আড্ডা দেওয়া কিংবা পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটানো ইসলাম সমর্থন করে না।
ইমানের সত্তরটির বেশি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।
মহানবী (সা.) সাহাবিদের রাস্তায় বসতে নিষেধ করেছিলেন। সাহাবিরা যখন জানালেন যে প্রয়োজনে তাঁদের রাস্তায় বসতে হয়, তখন তিনি বললেন, ‘যদি তোমাদের রাস্তায় বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে।’
রাস্তার হকগুলো হলো, দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের উত্তর দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৬৫)
রাস্তায় পড়ে থাকা এমন কোনো বস্তু, যা মানুষ বা যানবাহনের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা সরিয়ে ফেলা ইমানের অন্যতম শাখা এবং এটি একটি মহৎ সদকা হিসেবে গণ্য হয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ইমানের সত্তরটির বেশি শাখা রয়েছে; এর মধ্যে সর্বোচ্চ হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫)
অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, এক ব্যক্তি কেবল রাস্তা থেকে একটি কাঁটাযুক্ত ডাল সরিয়ে ফেলার কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে বেহেশত দান করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫২)
রাষ্ট্র যখন জনকল্যাণে কোনো আইন প্রণয়ন করে, যা কোরআন-হাদিসের পরিপন্থী নয়, তবে তা মেনে চলা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামি আইনবিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি হলো ‘ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না এবং অন্যের ক্ষতি করাও যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)
সড়কে নিজের বা অন্যের জীবন বিপন্ন হয় এমন যেকোনো কাজ থেকে বিরত থাকা মুমিনের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যখন জনকল্যাণে কোনো আইন তৈরি করে, যা কোরআন-হাদিসের পরিপন্থী নয়, তা মেনে চলা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আবশ্যকীয় হয়ে যায়।
ইমাম সুয়ুতি উল্লেখ করেছেন, ‘যেকোনো ধরনের ক্ষতি বা ক্ষতিকর পরিস্থিতি সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে দূর করা ওয়াজিব।’ (আস-সুয়ুতি, আল-আশবাহ ওয়ান নাজাইর, পৃষ্ঠা ৮৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৯)
সুতরাং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা ওভারটেকিংয়ের নামে অন্যের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা সরাসরি ধর্মীয় বিধানের লঙ্ঘন এবং পাপের কাজ।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বেপরোয়া গতি এবং চালকদের অহংকারী মানসিকতা। ইসলাম বিনয় ও নম্রতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে।
রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ হলো, ‘তুমি ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ কোরো না; তুমি তো কখনোই পদভারে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বতপ্রমাণ হতে পারবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৭)
গাড়ি চালানোর সময় সহনশীলতা, অন্যকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা এবং ধৈর্য ধারণ করা একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
একবার এক ব্যক্তি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি উট বেঁধে রেখে ভরসা করব, নাকি ছেড়ে দিয়ে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘আগে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’
ইসলামে যেকোনো বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসার কথা বলা হয়েছে, তবে এই ভরসার পূর্বশর্ত হলো সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা।
একবার এক ব্যক্তি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি উট বেঁধে রেখে ভরসা করব, নাকি ছেড়ে দিয়ে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘আগে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)।
অর্থাৎ সড়কে বের হওয়ার আগে গাড়ির ফিটনেস যাচাই করা এবং ট্রাফিক নিয়ম মানার মতো সব ধরনের সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে।
পাশাপাশি যানবাহনে ওঠার দোয়া পড়তে হবে। কোরআনে যানবাহনে আরোহণের চমৎকার দোয়া শেখানো হয়েছে, ‘সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হাজা অমা কুন্না লাহু মুকরিনিন (পবিত্র ও মহান সেই সত্তা, যিনি এগুলোকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, অথচ আমরা এগুলোকে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না)।’ (সুরা জুখরুফ, আয়াত: ১৩-১৪)
সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি কাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি অনেক ক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ও দায়িত্বহীনতার ফল। মুমিন হিসেবে পরকালের জবাবদিহির অনুভূতি থাকলে সড়কে চলাচলের সময় প্রতিটি মানুষ আরও দায়িত্বশীল হবে, যা একটি নিরাপদ সড়ক ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।