সদ্য বিদায়ী সেপ্টেম্বর মাসে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই এক মাসে মোট ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৬৭৪ জন। হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী এবং ৬১ জন শিশু রয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি নৌ ও রেলপথেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিদায়ী মাসে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এছাড়া ২৩টি রেল দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।

আজ রোববার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত ‘সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে’ এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটি তাদের এই প্রতিবেদনটি তৈরি করতে ৯টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব সংগৃহীত তথ্যের ওপর নির্ভর করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভাগীয় হিসেবে ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। শুধু রাজধানী ঢাকা শহরেই ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৪৭ জন। অন্যদিকে, সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলার হিসেবে গাজীপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

সড়ক দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। মোট দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশই ঘটেছে মোটরসাইকেলের কারণে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৯ জন। এছাড়া বাসের যাত্রী হিসেবে ২৬ জন, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-ট্রলি আরোহী ১৯ জন, মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ আরোহী ২১ জন, অটোরিকশা-অটোভ্যান-ইজিবাইক-সিএনজি-লেগুনার যাত্রী ৮৮ জন, নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটমের যাত্রী ১৮ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ৬ জন নিহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার স্থানভেদে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে। আঞ্চলিক সড়কে ঘটেছে ৪০ শতাংশ, গ্রামীণ সড়কে ১৩ শতাংশ এবং শহরের ভেতরে ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তির মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানো এবং চালকদের জন্য বিশেষ উদ্বুদ্ধকরণ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

দুর্ঘটনা রোধে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মোট ১২টি সুপারিশ প্রদান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার এবং দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়িয়ে তাঁদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এছাড়া সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ এবং টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন একত্র করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, “সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।”