দেশে ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৬ বছর ৯ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ জন শিশু নিহত হয়েছে। এই মর্মান্তিক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিহতের সংখ্যায় মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে প্রাণ হারানো শিশুদের হার সবচেয়ে বেশি। মোট নিহতের ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বা ২ হাজার ৯৫৮ শিশু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে। অন্যদিকে, পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৯৩ শিশু।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, তাদের এই প্রতিবেদনটি ৯টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থার নিজস্ব সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছে।
বয়সভেদে নিহতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। এই বয়সসীমার ৩ হাজার ৫৪৭ শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এছাড়া ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ শিশু এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ী দেখা গেছে, গ্রামীণ সড়কে শিশুদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৭১৩ শিশু গ্রামীণ সড়কে প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২ জন, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ জন এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ জন শিশু নিহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গ্রামীণ সড়কগুলো সাধারণত বসতবাড়ির পাশ দিয়ে চলে থাকে। এসব রাস্তায় যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়মরীতির যথাযথ অনুসরণ করা হয় না এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির অভাব থাকে, যার ফলে শিশুরা চরম ঝুঁকিতে পড়ে। পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম সম্পর্কে শিশুদের অজ্ঞতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পথচারী হিসেবে নিহত ২ হাজার ৮১২ শিশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৭১ জন থ্রি-হুইলারের ধাক্কায় বা চাপায় প্রাণ হারিয়েছে, যা পথচারী নিহতের ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের ধাক্কায় মারা গেছে ১ হাজার ১২ জন শিশু। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৩১৭ শিশু এবং বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেছে আরও ৯৮ শিশু।
দুর্ঘটনার সময়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিকেলে শিশু মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এই সময়ে ২ হাজার ৬৩৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩৩ দশমিক ০৭ শতাংশ। এছাড়া সকালে ২ হাজার ১৬৮ শিশু এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ শিশু নিহত হয়েছে। রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশুর মৃত্যুর কথা জানা গেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে ২ হাজার ৫১৩ শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এছাড়া বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু।
সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানোকে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসার সংকট এবং চিকিৎসা ব্যয় বহনে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতাকেও মৃত্যুর হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্থাটি ৬ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে— সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা শিশুবান্ধব করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করা, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ সরকারি তহবিল গঠন এবং সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়ন করা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রতিটি শিশুর মধ্যেই সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ সড়ক ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাবে নীরবে প্রাণ হারাচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।