জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক বছরের জন্য একটি সময়বদ্ধ ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি মনে করেন, শুধু দিবস পালন করা কিংবা দুর্ঘটনার পর দায়িত্বরত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার মধ্যে উদ্যোগ সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। বরং দুর্ঘটনার মূলে থাকা সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের ত্রুটি, পরিবহন পরিচালনা এবং তদারকির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষ্যে বুধবার (২১ অক্টোবর) লন্ডন থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি এসব কথা উল্লেখ করেন।
বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতার কারণে লন্ডনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তবে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আগের মতোই অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তার পাঠানো বার্তায় ইলিয়াস কাঞ্চন সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেন, “২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের একই দিন পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। এতে কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থা কী কাজ করবে, কখন করবে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।”
একই সঙ্গে তিনি দাবি জানান, আগামী জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে গত এক বছরের কার্যক্রমের একটি প্রকাশ্য মূল্যায়ন প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে এবং কেন সেই ঘাটতি পূরণ করা যায়নি—এই সমস্ত তথ্য দেশবাসীর সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান নিসচা চেয়ারম্যান।
তিনি আরও বলেন, “পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও সংশোধনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠবে।”
সড়ক দুর্ঘটনাকে নিয়তি বা দুর্ভাগ্য হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রচলিত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, “অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে থাকে চিহ্নিত বিভিন্ন ঝুঁকি। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, চালকের ক্লান্তি ও অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অনিরাপদ সড়ক, পথচারীদের নিরাপদে পারাপারের অভাব এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়া।”
তার মতে, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র যদি নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তবে এই ঝুঁকিগুলো কমিয়ে আনা সম্ভব। একটি নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অকালে বহু প্রাণ রক্ষা করা যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং বাজারের আশপাশে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং স্পষ্ট নির্দেশক চিহ্ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা যথাযথভাবে কার্যকর করার পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক ও টায়ার, অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। চালকদের লাইসেন্স প্রদানের আগে তাদের দক্ষতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পেশাদার চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং বিশ্রামের নিয়মগুলো কার্যকরভাবে মানার ওপর জোর দেন নিসচা চেয়ারম্যান।
দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান ও সময়, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ধরন এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক সংস্কার, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন এবং একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।