এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললেন মকবুল সাহেব। ঘুম ভাঙার পর থেকে তিনি লক্ষ্য করলেন, সবকিছু যেন অবিশ্বাস্যভাবে স্বাভাবিক। এমনকি একবারের জন্যও বিদ্যুৎ চলে যায়নি। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, হচ্ছেটা কী? তারে এত কারেন্ট! নাকি নিজের মাথার তার ছিঁড়ে গেছে? পাগল হয়ে যাচ্ছেন না তো? আয়হায়, এই টানাটানির সংসারে পাগল হয়ে গেলে তাকে পালবে কে?
সাতসকালে হঠাৎ কানে এল কা–কা শব্দ। মকবুল সাহেব অবাক হয়ে ভাবলেন, এটা কি ঢাকা? তিনি চোখ বন্ধ করে বোঝার চেষ্টা করলেন। বর্তমান ঢাকা শহরে এখন আর কাকডাকা ভোর নেই। এখনকার সকাল শুরু হয় মুঠোফোনের প্যাঁ–পোঁ শব্দে। তবে কি তিনি ভুল শুনলেন? আধবোজা চোখে জানালার পর্দা সরিয়ে তিনি দেখলেন, ৫/৬টি কাক কারেন্টের তারে বসে রীতিমতো মিটিং করছে। মাঝেমধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে কা–কা করে তারা যেন গুডমর্নিং অ্যালার্ম দিচ্ছে।
মনকাড়া এই দৃশ্য উপভোগ করার পর মুখ ধুতে বাথরুমে ঢুকলেন মকবুল। মুখ ধোয়ার সময় তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বেসিনের কলে পানি আসছে। তিনি ভাবলেন, আরে, বেসিনের কলে পানি এল কী করে? এখন তো বালতির জমানো পানি দিয়েই সব কাজ সারতে হয়। তবে কি সব বদলে গেল?
কাকডাকা সকালে কাকস্নানের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে মকবুল সাহেব আর ভাবাভাবিতে সময় নষ্ট করলেন না। তিনি শাওয়ার ছাড়লেন এবং প্রায় হাফ অ্যান আওয়ার সময় সেখানে কাটিয়ে দিলেন। তবে আর দেরি করা ঠিক হবে না বলে তিনি দ্রুত প্রস্তুত হতে শুরু করলেন, কারণ এখনই বের হতে না পারলে অফিসে লাল কালির দাগ পড়বে। তিনি যখন দ্রুত রেডি হয়ে পা বাড়ালেন, ঠিক তখনই পেছন থেকে ডাক দিলেন তাঁর এক যুগের পুরোনো স্ত্রী নীলা, ‘সকালে নাশতা না করে কই যাও? রুটি, আলুভাজি বানিয়েছি, খেয়ে যাও।’
মকবুল সাহেব চমকে উঠলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, চুলা জ্বলল কীভাবে? এটা কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার, নাকি কাক থেকে শুরু করে বাকি সবকিছুর মতো গ্যাসও অভিমান ভুলে ফিরে এসেছে?
আহ্, কতদিন পর হাতে বানানো গরম রুটি! মৃদুমন্দ বাতাস আর স্ত্রীর হাতের রুটি খেতে খেতে ওপরের দিকে তাকালেন মকবুল। দেখলেন, ফ্যান বন বন করে ঘুরছে। অবাক কাণ্ড! ঘুম ভাঙার পর থেকে এ পর্যন্ত একবারও কারেন্ট রেস্ট নিতে যায়নি। হচ্ছেটা কী? তারে এত কারেন্ট! নাকি নিজের মাথার তার ছিঁড়ে গেছে? পাগল হয়ে যাচ্ছেন না তো? আয়হায়, এই টানাটানির সংসারে পাগল হয়ে গেলে তাকে পালবে কে? তিনি চোখ বুজে বিড়বিড় করে তিনবার বললেন, ‘কুল, মকবুল, কুল; যা দেখছ, সব ভুল।’
ধীরে ধীরে চোখ মেললেন মকবুল। দেখলেন, নীলা মায়াভরা চোখে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। বউয়ের এমন কাকচক্ষু কবে দেখেছিলেন, মনে করার চেষ্টা করলেন মকবুল। তবে বেশিক্ষণ চেষ্টা করতে হলো না।
হঠাৎ প্রবলবেগে ঝাঁকুনির সঙ্গে কানে ভেসে এল নীলার সিংহীনাদ, ‘লাটসাহেবের আজ হইছে কী? অফিস নাই? নাকি দিছে অফিস থেকে বের করে?’
সেই চিৎকারে ঘুম থেকে ধরফর করে উঠে পড়লেন মকবুল। দেখা গেল, সারা শরীর ঘামে ভেজা। প্রচণ্ড গরমে অস্থির হয়ে তিনি ফ্যানের সুইচ চাপাচাপি শুরু করলেন। কিন্তু তিনি অস্থির হলেও ফ্যানটি ছিল স্থির। বাথরুমের কল ছাড়তেই দেখা গেল সেখান থেকে কেবল ভুস করে বাতাস বের হয়ে আসছে।
অবশেষে ঘামে ভেজা শার্ট–প্যান্ট পরে রাস্তায় নামলেন মকবুল। বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে তিনি বিড়বিড় করে নিজেকে বললেন, ‘কুল, মকবুল, কুল; কাকফাঁকা শহরে স্বপ্ন দেখাই ভুল।’