দীর্ঘদিন ধরে ব্যাটারিচালিত রিকশাদের জীবন ছিল অনেকটা স্বাধীন শিল্পীর মতো, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না এবং যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাত্রা করা যেত। তবে এবার তাদের এই জীবনযাত্রায় আসছে কঠোর নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলা। নতুন নীতিমালার আওতায় এখন থেকে অঞ্চলভেদে চলাচল, নির্দিষ্ট রং ব্যবহার, ফিটনেস যাচাই এবং চালকদের প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে। এই নতুন জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা জানতে এক ব্যাটারিচালিত রিকশাকে যেন এক কাল্পনিক চাকরির ইন্টারভিউতে ডাকা হলো। ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রশ্নকর্তার ভূমিকায় ছিলেন মাহমুদুল হাসান।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই তার নাম জানতে চাওয়া হলে সে উত্তর দেয়, “ব্যাটারিচালিত রিকশা।”
তার কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে জানায়, “ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—সব জায়গায় কাজ করেছি।”
নির্দিষ্ট কোনো কর্মক্ষেত্র ছিল কি না জানতে চাওয়া হলে সে বলে, “ছিল না। এটাই আমার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।”
তবে নতুন নীতিমালায় নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচল করতে হতে পারে বলে জানানো হলে রিকশাটি অবাক হয়ে বলে, “তাই নাকি! এত দিন পর বুঝলাম, আমারও অফিসের ঠিকানা হবে।”
ঢাকা শহরকে কয়েকটি জোনে ভাগ করা হলে কোনো অসুবিধা হবে কি না, সেই প্রশ্নে সে জানায়, “না। শুধু একটা অনুরোধ—জোন যেন এত ছোট না হয় যে এক যাত্রী তুলেই জোন শেষ হয়ে যায়।”
নতুন নিয়মে গায়ে আলাদা রং করার বিষয়ে তার অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে সে বলে, “ভালোই। এত দিন মানুষ আমাকে দেখে শুধু ‘রিকশা’ বলত। এখন অন্তত রং দেখে বুঝবে, আমি কোন এলাকার নাগরিক।”
জিপিএস বা জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি সম্পর্কে তার ধারণা জানতে চাওয়া হলে সে রসিকতা করে বলে, “এত দিন যাত্রী আমাকে খুঁজত। এখন শুনছি সরকারও আমাকে খুঁজবে।” চালকদের প্রশিক্ষণ ও ফিটনেসের বিষয়টি ভালো বলে উল্লেখ করে সে আরও যোগ করে, “এটা ভালো। তবে চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার আগে যাত্রীদেরও একটু প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।”
যাত্রীদের কী প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে সে বলে, “‘ভাই, একটু দ্রুত যান’ বলার আগে রাস্তার অবস্থা দেখা।”
তার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি কী, তা জানতে চাওয়া হলে সে আক্ষেপ করে বলে, “মানুষ আমাকে একদিকে চায়, আবার অন্যদিকে চায় না। বাহন হিসেবে সবাই ভালোবাসে, যানজটের কারণ হিসেবে কেউই পছন্দ করে না।”
নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে সে বদলে যাবে কি না, সেই প্রশ্নে সে আত্মবিশ্বাসের সাথে জানায়, “অবশ্যই। এত দিন ছিলাম ‘যেদিকে রাস্তা, সেদিকেই যাত্রা’। এখন হব— 'যেদিকে নীতিমালা, সেদিকে যাত্রা।’”
সাক্ষাৎকারের শেষ প্রশ্নে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সে জানায়, “আগে ঠিকানা ঠিক করব, তারপর ফিটনেস করাব, তারপর রং করাব। এরপর যাত্রী নিয়ে বের হব।”
সবশেষে, যদি কোনো যাত্রী তাকে শর্টকাটে যাওয়ার অনুরোধ করে, তবে সে কী বলবে? সে উত্তর দেয়, “বলব, 'স্যার, শর্টকাটের যুগ শেষ, এখন আমারও নীতিমালা আছে!’”