দেশের সকল সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে নতুন বিধিমালা জারি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই নতুন নির্দেশনার আওতায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া একজন ব্যক্তি তার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নিতে পারবেন।
বিধিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য পূরণ না করলে কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। নতুন এই বিধিমালায় ই-রিকশার চলাচলের নির্দিষ্ট স্থান, গতিসীমা, যাত্রী ধারণক্ষমতা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া, ফি, ফিটনেস, প্রযুক্তিগত মান এবং চালকদের দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
যেসব সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশাকে সর্বদা সড়কের বাঁ পাশের লেন দিয়ে চলাচল করতে হবে। তবে জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোরে এসব যান চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাধারণ অবস্থায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার হলেও স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় এই গতি সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বিধিমালায় বলা হয়েছে, "ই-রিকশার আকার ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে।"
যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ই-রিকশায় ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতার হর্ন ব্যবহার করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে।
আবেদন, বয়স ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া
ই-রিকশার নিবন্ধন পেতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। নির্ধারিত ফি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট আবেদন ফরম পূরণ করে কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। আবেদন এবং দাখিল করা কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ই-রিকশার সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা হবে। এসব বিষয়ে সন্তুষ্ট হলে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
নিবন্ধন ফি
যাত্রী ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে দুজন যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার প্রারম্ভিক এককালীন নিবন্ধন ফি আট হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি চার হাজার টাকা। অন্যদিকে চারজন যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতিটি ই-রিকশার ফিটনেস সার্টিফিকেটের জন্য এক হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিউআর কোডযুক্ত নম্বরপ্লেট
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নির্দিষ্ট নম্বর প্লেট প্রদান করা হবে। এই নম্বর ও প্লেটগুলো যানবাহনের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে কোনো একটি সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, ই-রিকশার নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষ হলে নির্ধারিত ফি দিয়ে নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে। নিবন্ধন গ্রহণ বা নবায়ন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না। বর্তমানে সড়কে চলাচলরত ই-রিকশাগুলোকেও নিবন্ধন পেতে হলে বুয়েটের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নকশা পরিবর্তন করতে হবে।
স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন
প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ই-রিকশায় বুয়েট নির্ধারিত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি যানবাহনে স্পিডোমিটার বা ওডোমিটার স্থাপন করতে হবে। কোনো যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন অবৈধ ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
বিধিমালায় প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়সীমা শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নম্বর প্লেটসহ নিবন্ধন বাতিল করতে হবে।
চার্জিং ব্যবস্থা
ব্যাটারি চার্জের ক্ষেত্রে বিধিমালায় বলা হয়েছে, ই-রিকশার ব্যাটারি সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট অথবা নির্ধারিত গ্যারেজে চার্জ দিতে হবে। এসব চার্জিং পয়েন্ট বা গ্যারেজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ই-রিকশা চালকদের দায়িত্ব ও নিষিদ্ধ কার্যক্রমও উল্লেখ করা হয়েছে নতুন বিধিমালায়। নিবন্ধন ছাড়া যান চালানো, অনুমোদিত গতিসীমা অতিক্রম করা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অননুমোদিত ব্যাটারি ব্যবহার, মোটর বা যানবাহনের কাঠামো পরিবর্তন এবং নিষিদ্ধ সড়ক বা এলাকায় ই-রিকশা চালানো আইনত দণ্ডনীয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিধিমালায়।
প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, এ ছাড়া বিপজ্জনকভাবে যান চালানো এবং দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়াও দণ্ডনীয় অপরাধ। দুর্ঘটনা ঘটলে চালককে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে।