মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) করার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে প্রথম পর্যায়ের তিন দিনব্যাপী এই আলোচনা প্রক্রিয়া চলছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শুভংকর কর্মকার।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার লক্ষ্য রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে চুক্তি করা কতটা সম্ভব?

আনোয়ার শহীদ: “ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি করা সম্ভব। আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দুই দেশের সরকারপ্রধান ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সাধারণত এফটিএ আলোচনা সময়সাপেক্ষ হয়। অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য খুবই কম।”

তিনি আরও জানান, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ অনেক বাণিজ্যসুবিধা হারাবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ১০ থেকে ১২টি দেশের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা সফল করতে উভয় পক্ষের আন্তরিকতা প্রয়োজন। তাঁর মতে, “অন্তত চার–পাঁচটি, এমনকি ছয়–সাতটি বৈঠকেরও প্রয়োজন হতে পারে। দুই পক্ষ খোলা মন নিয়ে এগোলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি করা সম্ভব।”

বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার বড় ধরনের বাণিজ্যঘাটতি আছে। ফলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ করলে বাংলাদেশের কি লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে?

আনোয়ার শহীদ: “মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যঘাটতির বড় কারণ হলো, আমাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য একেবারেই কম। আমরা মালয়েশিয়া থেকে অনেক বেশি আমদানি করি, কিন্তু সে তুলনায় রপ্তানি করতে পারি না। তাই শুধু আমদানি–রপ্তানির ভারসাম্য নিয়ে চিন্তা করলে হবে না; আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধির উপায় খুঁজতে হবে। এফটিএ মানেই কিন্তু সব পণ্যের শুল্ক সঙ্গে সঙ্গে শূন্য করে দেওয়া নয়। অনেক ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর ব্যবস্থা থাকে। কোন পণ্যে কতটা ছাড় দেওয়া হবে, কখন দেওয়া হবে, সেটা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

তিনি উল্লেখ করেন যে, মালয়েশিয়া থেকে জ্বালানি ও ভোজ্যতেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে হয়। এসব পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্ক কমানোর ফলে সুবিধা পাওয়া গেলেও বাণিজ্যঘাটতি কমবে না। তাই আলোচনায় আমদানি চাহিদার পাশাপাশি রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। কোন পণ্যগুলো মালয়েশিয়ার বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করা যায়, তা চিহ্নিত করে দর-কষাকষির সময় বিবেচনায় রাখা জরুরি। সব মিলিয়ে এফটিএ হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে।

বাংলাদেশের কোন কোন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে?

আনোয়ার শহীদ: “আমাদের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের বড় সম্ভাবনা আছে। মালয়েশিয়া চেম্বার থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে হালাল পণ্যে জোর দেওয়ার কথা বলছি। এ ক্ষেত্রে হালাল সনদ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের হালাল পণ্যের সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা দরকার। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার কাছে সেই সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা দরকার। এটা করা গেলে বাংলাদেশের অনেক পণ্য ওই বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি তৈরি পোশাক, ওষুধ, রাসায়নিক পণ্য, গৃহসজ্জার বস্ত্র, হিমায়িত খাদ্য ও আসবাব রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে বলে আমরা মনে করি।”

খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি সেবা রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন তিনি। সাধারণত জনশক্তি রপ্তানি বলতে নির্মাণ বা বাগান শ্রমিকদের বোঝানো হয়, তবে সেবা খাতের পরিধি অনেক বিস্তৃত। সেমিকন্ডাক্টর নকশার মতো প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক কাজে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে পারলে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বড় সুযোগ তৈরি হবে।

মালয়েশিয়া এখন পর্যন্ত ভারত, পাকিস্তানসহ ১৪টি দেশের সঙ্গে এফটিএ করেছে। বাংলাদেশের কি ওই চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা উচিত?

আনোয়ার শহীদ: “অবশ্যই। মালয়েশিয়া অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কী ধরনের চুক্তি করেছে, কোন পণ্যে কী সুবিধা দিয়েছে, আর সেসব চুক্তির ফলে কী ধরনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা আমাদের দেখতে হবে। কারণ, বাংলাদেশে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা ও দর–কষাকষির অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম। এত দিন এ বিষয়টি আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল না। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা বা এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা কমে আসবে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণে বিষয়টি সামনে এসেছে।”

এফটিএর আলোচনায় কি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা দরকার?

আনোয়ার শহীদ: “অবশ্যই। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মতামত নেওয়া উচিত। কারণ, ব্যবসা–বাণিজ্য বা রপ্তানি—এসব বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরাই করেন। ফলে কোন পণ্যে কী ধরনের সুযোগ আছে, কোন জায়গায় সমস্যা আছে, সেগুলো ব্যবসায়ীরা ভালো জানেন। আমরা মনে করি, বেসরকারি খাতের মতামত নেওয়া হলে আলোচনা আরও কার্যকর হবে। তবে বেসরকারি খাতকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হবে নাকি করা হবে না, তা সরকারের এখতিয়ার।”

এফটিএর মাধ্যমে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করার সুযোগ আছে কি?

আনোয়ার শহীদ: “অবশ্যই সুযোগ আছে, তা করতেও হবে। বাণিজ্যকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি বলা হয়। এফটিএর কারণে যে শুধু পণ্য আমদানি–রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি পায়, তা নয়; বরং বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এফটিএর আলোচনায় সেটা মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে কোন কোন খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আসতে পারে, তা চিহ্নিত করা দরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদেরও মালয়েশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ খুঁজতে হবে অবশ্যই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মালয়েশিয়াকে আমরা দক্ষিণ–পূর্ব এশীয় বাজারের প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। তাদের সঙ্গে আমরা এফটিএ করতে সফল হলে অন্য দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা যাবে।”

এফটিএর আলোচনায় জনশক্তি রপ্তানি বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাওয়া উচিত?

আনোয়ার শহীদ: “মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি সহজ করার বিষয়টি অবশ্যই এফটিএর আলোচনায় থাকা দরকার। আমাদের মানুষেরা বিদেশে কাজ করতে যাচ্ছেন ঠিক, কিন্তু এখনো তাঁরা মূলত কম দক্ষতার কাজে নিয়োজিত। আমরা যদি এই শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রযুক্তি ও অন্যান্য উচ্চ মূল্যের সেবায় তাঁদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেমিকন্ডাক্টর নকশার মতো কাজে দক্ষ জনবল তৈরি করা গেলে যদি কয়েক শ কর্মীও বিদেশে কাজের সুযোগ পান, সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য আয় হতে পারে। সে জন্য বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জনবল তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।”