ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে ডেনিম পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি–আগস্ট) বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানির পরিমাণে হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। এর বিপরীতে চীন, মিসর, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর রপ্তানি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইইউর পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের দেওয়া তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ২৯৫ কোটি ইউরোর ডেনিম পোশাক আমদানি করেছে ইইউর দেশগুলো। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানির পরিমাণ ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ কমেছে।
ইইউর সামগ্রিক আমদানির হারের চেয়ে বাংলাদেশ থেকে ডেনিম আমদানির পরিমাণ বেশি কমেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশ ৮৭ কোটি ইউরোর ডেনিম রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। বর্তমানে ইইউর ডেনিম পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশে।
ডেনিম পোশাক রপ্তানিতে ইইউ বাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশটি ৫৩ কোটি ইউরোর ডেনিম রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ কম। বর্তমানে ইইউর ডেনিম পোশাক বাজারের ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ পাকিস্তানের দখলে রয়েছে।
এই বাজারে তৃতীয় ও চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানিকারক যথাক্রমে তুরস্ক ও তিউনিসিয়া। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে তুরস্কের ডেনিম পোশাক রপ্তানি ২১ শতাংশ কমে ৪৪ কোটি ইউরোতে নেমেছে। অন্যদিকে, আফ্রিকা মহাদেশের তিউনিসিয়া ২২ কোটি ইউরোর ডেনিম রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম।
তবে ইইউতে ডেনিম রপ্তানিতে বাংলাদেশের ঠিক পেছনে থাকা দেশগুলোর অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকৃত প্রতিযোগিতা অন্য জায়গায়। কারণ, চারটি প্রতিযোগী দেশের ডেনিম পোশাক রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৬ শতাংশ কমলেও ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ৪৫ শতাংশ।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীন থেকে ইইউর ডেনিম রপ্তানি ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ২০ কোটি ইউরো হয়েছে। বর্তমানে এই বাজারে চীনের হিস্যা ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে, গত জানুয়ারি–আগস্টে মিসরের ডেনিম পোশাক রপ্তানি ৩১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ কোটি ইউরোতে পৌঁছেছে। বর্তমানে বাজারটিতে মিসরের হিস্যাও ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
এর পরবর্তী অবস্থানে থাকা কম্বোডিয়া ও মরক্কোর ডেনিম পোশাক রপ্তানি যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ ও ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কম্বোডিয়া ১৪ কোটি ইউরো এবং মরক্কো ৬ কোটি ইউরোর ডেনিম রপ্তানি করেছে।
এদিকে, ইইউতে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পাঁচ কোটি ইউরোর ডেনিম তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া ভারত গত জানুয়ারি–আগস্ট সময়ে তিন কোটি ডলারের ডেনিম পোশাক রপ্তানি করেছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি।
চলতি বছরের শুরুতে ইইউর বাজারে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও আগস্ট মাসে ডেনিম পোশাকের রপ্তানি ১২ দশমিক ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে রপ্তানি হয়েছে ১৩ কোটি ৪১ লাখ ইউরো। উল্লেখ্য, আগস্টে ইইউর সামগ্রিক ডেনিম আমদানিও ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ বেড়ে ৪৩ কোটি ইউরো হয়েছে।
তবে রপ্তানি বৃদ্ধির গতিতে পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। আগস্টে পাকিস্তানের ডেনিম রপ্তানি প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ইউরো হয়েছে। এই সময়ে তুরস্কের রপ্তানি ১৩ শতাংশ কমলেও তিউনিসিয়ার রপ্তানি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, আগস্টে চীনের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ এবং মিসরের রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ৫৯ শতাংশ। কম্বোডিয়ার রপ্তানি প্রায় ১১ শতাংশ বাড়লেও ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে ৫৬ শতাংশ এবং ভারতের রপ্তানি বেড়েছে ৫২ শতাংশ।
এই পরিস্থিতি সম্পর্কে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মহিউদ্দিন রুবেল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ক্রয়াদেশ কম থাকলেও পরের তিন মাস কিছুটা ভালো হয়। সে জন্য রপ্তানি কমার হার কমে আসছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলো রপ্তানিতে আমাদের চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি করেছে। তার অন্যতম কারণ, আমরা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে ভালো দাম অফার করতে পারছি না। গ্যাস–বিদ্যুতের উচ্চ মূল্যের পাশাপাশি সংকটে ভুগছে কারখানাগুলো। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। তা ছাড়া আমাদের পণ্যে বৈচিত্র্য প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে কম।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘ইইউর সঙ্গে ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য (এফটিএ) চুক্তি করেছে। ভারতও এফটিএ করার চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। সে কারণে ক্রেতাদের মধ্যে দেশ দুটি থেকে ডেনিম পোশাক কেনার আগ্রহ বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণ হয়ে গেলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক বাজারের সুবিধা বা জিএসপি থাকবে না। তখন শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য আমাদেরও এফটিএ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’