ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। যেখানে বাংলাদেশ রপ্তানি কমিয়ে এনেছে, সেখানে উল্টো প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো। ফলে ইইউর পোশাক বাজারে এই দুই দেশের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। বিপরীতে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তবে এই সময়ে বাংলাদেশ ছাড়াও তুরস্ক ও ভারতের পোশাক রপ্তানিতেও পতনের চিত্র দেখা গেছে।

ইউরোস্ট্যাটের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইইউর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সামগ্রিকভাবে তৈরি পোশাক আমদানি যতটুকু কমিয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে প্রায় তিন গুণ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউতে বাংলাদেশ ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫৮ কোটি ইউরো অথবা ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কম। অন্যদিকে, চীন চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউর বাজারে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ইউরো বেশি। একই সময়ে ভিয়েতনাম ৩০০ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৩ কোটি ইউরো অথবা ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি।

রপ্তানির এই নিম্নমুখী প্রবণতার ফলে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাজার হিস্যাও সংকুচিত হয়েছে। গত বছরের প্রথম আট মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল প্রায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা চলতি বছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে।

অন্যদিকে, বাজার হিস্যায় নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে চীন। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে চীনের হিস্যা ৩০ দশমিক ৭২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারের সামগ্রিক আকার কিছুটা ছোট হলেও চীন সেখানে নিজের প্রভাব আরও বাড়িয়েছে। ইইউর বাজারে চীন বর্তমানে শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এবং তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আছে তুরস্ক। এরপরই অবস্থান করছে ভারত ও ভিয়েতনাম।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিয়েতনামের রপ্তানির পরিমাণ কমলেও তারা প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য বাড়িয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে, চীন পোশাকের গড় মূল্য কমিয়ে এবং রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে তাদের শীর্ষ অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। তুরস্কের রপ্তানি করা পোশাকের গড় মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৪ শতাংশ। পাশাপাশি প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে নেমেছে। অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পোশাকের গড় মূল্য কমেছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। ফলে রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস এবং কম দাম—এই দুই কারণে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

তৈরি পোশাকশিল্পের একাধিক উদ্যোক্তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর সেখানে চীনের পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক বেড়ে যায়। এর ফলে চীনারা ইইউর বাজারে অত্যন্ত আগ্রাসী বিপণন কৌশল শুরু করে এবং পোশাকের কম দাম অফার করে। এই পরিস্থিতির কারণে ইইউ বাজারে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। এছাড়া ইইউর অর্থনীতি কিছুটা মন্দার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় বছরের শুরুর মাসগুলোতে অধিকাংশ দেশের পোশাক রপ্তানিই কমে গিয়েছিল।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে ইইউর ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক আমদানি বাড়িয়েছে। ফলে আমাদেরও পোশাক রপ্তানি কিছুটা ইতিবাচক হয়েছে। তবে চীন যেহেতু আগে থেকেই আগ্রাসী বিপণন করছিল, সেহেতু ইইউর বাজার পুনরুদ্ধার হওয়ার সময় চীনের ব্যবসা বেশি বেড়েছে। তবে বাংলাদেশও ব্যবধান কমিয়ে আনছে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতির খুব বেশি অবনতি না হলে সামনের দিনগুলোতে ইইউর বাজার আরেকটু ঘুরে দাঁড়াতে পারে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তবে মহিউদ্দিন রুবেল সতর্ক করে বলেন, রপ্তানির তালিকায় বৈচিত্র্যময় পোশাক যুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা না বাড়ালে খুব বেশি উন্নতির সুযোগ নেই।