বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করতে হলে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে মনে করেন নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী শুর্দ শুর্দসমার। গত মঙ্গলবার তাঁর একদিনের সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফরকালে মুক্তকণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মত ব্যক্ত করেন।

ডাচ মন্ত্রীর মতে, নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহী। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে কিছু অশুল্ক বাধা দূর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে নিজ দেশের উদাহরণ দিয়ে শুর্দসমার বলেন, নেদারল্যান্ডসে স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চা বিদ্যমান। সেখানে সাংবাদিকেরা অনেক সময় অত্যন্ত সমালোচনামূলক প্রশ্ন করেন। মন্ত্রী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে সেই প্রশ্নগুলো পছন্দ না-ও হতে পারে, তবে যৌক্তিক ভিত্তি থাকলে সেগুলোর উত্তর দিতেই হয়। একইভাবে পার্লামেন্টের কাছেও জবাবদিহি করতে হয় তাঁদের।

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সম্পর্ক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে শুর্দসমার বলেন, ‘স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ চাইলে এবং ডাচ ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আসুক—এটা চাইলে একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মানে হলো তাঁরা জানতে পারেন যে তাঁদের বিনিয়োগ নিরাপদ থাকবে। ডাচ বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা পুরো চিত্রটাই বিবেচনা করেন।’

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করেছেন ডাচ মন্ত্রী। তিনি জানান, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার গুরুত্ব নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছে। অন্যদিকে, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই সংস্কারগুলো যেন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেই বিষয়ে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শুর্দসমার। তাঁর মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাতে তাঁরা আশাবাদী। তিনি একে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পুনরুত্থান এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি বড় সূচনা হিসেবে অভিহিত করেন।

শুর্দসমার উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সংস্কার বাস্তবায়নের একটি বিশেষ তাগিদ রয়েছে। তবে কেবল গণতান্ত্রিক উত্তরণই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেও সমানভাবে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি আরও জানান, এই দুই ক্ষেত্রেই নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার হতে প্রস্তুত। তবে এর জন্য বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে শুর্দসমার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেক সুযোগ তৈরি করেছে। স্থিতিশীলতা দৃশ্যমান হচ্ছে। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। নতুন সরকার ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত এবং বিনিয়োগকারীদের স্বাগত জানাচ্ছে।

তবে সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার ওপর জোর দিয়ে ডাচ মন্ত্রী বলেন, সংস্কার এক দিনে করা সম্ভব নয়। সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও প্রতিদিন তা বাস্তবায়ন করতে হয়। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টায় সহযোগিতা প্রয়োজন।

বাণিজ্যিক চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বাণিজ্যচুক্তির দিকে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি, কিন্তু যে চ্যালেঞ্জগুলো (অশুল্ক বাধা) এখনো রয়ে গেছে, সেগুলোও যত দ্রুত সম্ভব সমাধান হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

বাংলাদেশ ও ইইউ-এর ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়ে শুর্দসমার জানান, ইইউ ও বাংলাদেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করতে হলে শ্রমিকদের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। নেদারল্যান্ডস মনে করে, ইইউ ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্রুত একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি হওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং নেদারল্যান্ডস এই চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে।

বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে পুনরায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা বাণিজ্যচুক্তির দিকে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি, কিন্তু যে চ্যালেঞ্জগুলো (অশুল্ক বাধা) এখনো রয়ে গেছে, সেগুলোও যত দ্রুত সম্ভব সমাধান হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।’