তিন দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বহুবার রাজনৈতিকভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে প্রতিবারই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তির কথা যারা আগেভাগে লিখেছিলেন, তারা ভুল ছিলেন। ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বারবার প্রতিকূলতাকে জয় করে ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন।

গত রোববার অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, এবার হয়তো তাঁর বিরোধীরা দীর্ঘ শাসনের ইতি টানার সুযোগ পেয়েছেন। তবে দেশটির জটিল ও নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। তবে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ পদের জন্য কোনো স্পষ্ট বিজয়ী পাওয়া যায়নি। এর ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে, যেখানে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ভোট গণনার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে, ১২০ আসনের পার্লামেন্টে যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ২৬টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে অবস্থান করছে। তবে তাঁর ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের বিপরীতে তারা ৫৩টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু এবার সরাসরি জিততে পারেননি, তবে তিনি পুরোপুরি হেরেও যাননি। এখন তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরকার গঠন থেকে বাধা দেওয়া। যদি তিনি এতে সফল হন, তবে আবারও ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ প্রশস্ত হবে তাঁর জন্য।

কাগজে-কলমে আরব দলগুলোসহ বিরোধী শিবিরের হাতে প্রায় ৬৭টি আসন রয়েছে। তবে এই জোট মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে খণ্ডিত। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের দল ২১টি আসন জিতেছে। তাঁর শিবিরের অন্যান্য ইহুদি দলগুলোর আসন মিলিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮টি, যা জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে অনেক কম।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের কোটায় পৌঁছাতে হলে তাঁদের রাআম এবং জয়েন্ট লিস্ট নামের দুটি আরব দলের সমর্থন প্রয়োজন। ধারণা করা হচ্ছে, এই আরব দলগুলো যৌথভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আরব বা ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের এই রেকর্ডসংখ্যক উপস্থিতির মূলে রয়েছে গত চার বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভিরের প্রতি তীব্র ক্ষোভ। তাঁর মেয়াদে উগ্রপন্থী ইহুদিদের কর্মকাণ্ড আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং তিনি নিয়মিত আরব ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে এসেছেন।

ঠিক এই জায়গাতেই রাজনৈতিক হিসাব জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাআম একটি ইসলামপন্থী দল, যাদের মূল ভিত্তি ইসরায়েলের বেদুইন সম্প্রদায়। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর এই দলের নেতা মানসুর আব্বাস প্রথম আরব রাজনীতিবিদ হিসেবে ইসরায়েলি সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্ট একটি বড় আরব জোট হতে যাচ্ছে, যা মূলত কয়েকটি ছোট দলের সমন্বয়ে গঠিত। এই জোটে কমিউনিস্ট হাদাশ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তাল এবং জাতীয়তাবাদী বালাদ গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গত বুধবার বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান তাঁর সহযোগীদের আরব দলগুলোকে তাঁদের জোটে টানার আহ্বান জানান। তিনি নেতানিয়াহুর ‘ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে বর্ণবাদী বিভাজন’-এর নীতি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে আইজেনকটের দুই ডানপন্থী মিত্র নাফতালি বেনেট এবং অবিগদোর লিবারম্যান আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল যেকোনো সরকারের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।

এদিকে জয়েন্ট লিস্ট বুধবার জানিয়েছে, তারা রাজনৈতিক সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত। তারা বলেছে, “নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান ঘটাতে তাঁরা সবকিছু করতে ইচ্ছুক।”

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন-পরবর্তী তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে ইহুদি-আরব রাজনৈতিক সহযোগিতাকে অবৈধ ঘোষণা করা এবং এর মাধ্যমে বিরোধীদের প্রতিহত করা। কারণ, বিরোধীরা আরব দলগুলোর সমর্থন পেলে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে।

সূত্রটি আরও জানায়, নেতানিয়াহু একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠন নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত। তিনি এমনকি একক বিরোধী আইনপ্রণেতাদের আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা না করতে চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। নির্বাচনজুড়ে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর পর লিকুদ পার্টি বুধবার এক বিবৃতিতে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ‘নির্বাচন ছিনতাই’ করার অভিযোগ তুলেছে।

২০২০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে পরাজয়ের পর নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছিলেন, লিকুদ পার্টি ঠিক সেই একই কৌশল অবলম্বন করেছে। সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটি বুধবার জানিয়েছে, তারা লিকুদ পার্টির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। তবে কমিটি নির্বাচনের দিনই বিভিন্ন দলের হাজার হাজার অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছিল।

সিএনএন-কে ওই সূত্রটি জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ‘ইরানে হামলা চালানো বা তাঁর পক্ষ হয়ে ইসরায়েলি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিযুক্ত করাসহ যেকোনো উপায়ে এই সম্ভাবনাকে নিষ্ক্রিয় করার’ পরিকল্পনা করছেন।

বিরোধীদের আশঙ্কা, নতুন সরকার গঠন স্থগিত বা ব্যর্থ করতে নেতানিয়াহু যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা-সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। নির্বাচনের আগে তিনি ট্রাম্পকে ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালানোর চাপ দিয়েছিলেন, কিন্তু ওয়াশিংটন তাতে সাড়া দেয়নি। আংশিকভাবে ইসরায়েলের সামরিক চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির সতর্ক করেছিলেন যে, এমন পদক্ষেপ নির্বাচনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র সিএনএন-কে জানিয়েছে, ইরানে হামলার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে এবং তা ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সম্ভবত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এই হামলা চালানো হতে পারে।

একটি বিরোধী সূত্র সিএনএন-কে বলেছে, “নেতানিয়াহু কী করবেন, তা জানার কোনো উপায় নেই। আমাদের মনে হচ্ছে, তিনি নতুন করে আরেকটি উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা করতে পারেন।” আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করাসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় না ছাড়তে যা যা করা সম্ভব, তার সবই করবেন।

ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) সাবেক প্রধান আইজেনকট মঙ্গলবার রাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাপ্রধানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মনে করিয়ে দেন, “জনগণের রায় ও ম্যান্ডেট ছাড়া নেতানিয়াহু কেবল একজন অন্তর্বর্তী (কেয়ারটেকার) প্রধানমন্ত্রী।” বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পরপরই সমর্থকদের উদ্দেশে আইজেনকট ঘোষণা করেন, জনগণ “পরিবর্তনকে বেছে নিয়েছে”।

মঙ্গলবার রাতের ভাষণের পর হালনাগাদ ফলাফল জানার পর আইজেনকট প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলেন, তিনি “ইসরায়েলে পরিবর্তন আনার” ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আছেন।

ভোটের সংখ্যার হিসাব এখনো পরিবর্তিত হতে পারে। বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটি বেশির ভাগ ব্যালট গণনা শেষ করেছে। এখন সেনাসদস্য, বন্দী, হাসপাতালের রোগী ও কর্মী, বিদেশের কূটনীতিক এবং প্রতিবন্ধী ভোটারদের ডাবল-এনভেলপ ব্যালট গণনার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে কমিটি।

কমিটির অনুমান, ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার ডাবল এনভেলপ রয়েছে, যা ১০টির বেশি আসনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। এগুলো একটি বিশেষ যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় আলাদাভাবে গণনা করা হয় এবং চূড়ান্ত ফলাফল আজ বৃহস্পতিবার পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এরপর শুরু হবে মূল রাজনৈতিক চালবাজি। পরবর্তী পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের ওপর নির্ভর করছে। নির্বাচন-পরবর্তী তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজ হবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন অর্জন করতে পারবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন, তেমন কাউকে পরামর্শ দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মনোনীত করার আগে তিনি নির্বাচিত সব দলের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এই প্রার্থী বাধ্যতামূলকভাবে একক বৃহত্তম দলের নেতা হবেন তা নয়, বরং যাঁর জোট গঠনের বাস্তবসম্মত পথ রয়েছে, তিনিই মনোনীত হবেন।

বিশেষজ্ঞরা মিশ্র নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করছেন। মনোনীত প্রার্থীর কাছে সরকার গঠনের জন্য অন্যান্য দলের সঙ্গে মন্ত্রিসভার পদ, বাজেট ও নীতি নিয়ে আলোচনার জন্য ২৮ দিন সময় থাকে। প্রয়োজনে এই সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যায়। তিনি ব্যর্থ হলে, অন্য একজন প্রার্থীর কাছে পরবর্তী চার সপ্তাহের জন্য সেই দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। তিনিও ব্যর্থ হলে, নেসেট একটি বিকল্প প্রার্থী দেওয়ার অল্প সময় পায়।

নেসেটও যদি ব্যর্থ হয়, তবে দেশটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর একটি সহজাত সুবিধা রয়েছে। আইজেনকট যদি প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়ে ব্যর্থ হন, তবে নেতানিয়াহুকে শুধু নিজের সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে। আর ইসরায়েল যদি নতুন নির্বাচনের পথে যায়, তবে নেতানিয়াহু মাসের পর মাস অন্তর্বর্তী প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় বহাল থাকবেন।

এমনকি সরকার গঠন না করেও বিরোধীরা নেসেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে স্পিকার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন কাউকে নিয়োগ দিতে পারবে। এতে নেতানিয়াহুর শাসন করার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে এবং বিরোধীদের আইন প্রণয়নের সুযোগ করে দিতে পারে।

তবে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইজেনকট তাঁর পছন্দের যুদ্ধক্ষেত্রে নেই। নেতানিয়াহুর জোট অত্যন্ত অনুগত এবং দলত্যাগের বিষয়ে তাঁকে খুব বেশি ভাবতে হয় না। কিন্তু আইজেনকটের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়। তাঁর বৈচিত্র্যময় জোটের মতাদর্শিক মিল বেশ কম, ফলে সামান্যতম ভুল পদক্ষেপও জোটটিকে ভেঙে চুরমার করে দেশকে পুনরায় নির্বাচনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আপাতত সব নজর হারজগের দিকে। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে যাঁর ভূমিকা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি হয়তো নেতানিয়াহু ও আইজেনকটকে একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

গত বুধবার হারজগ বলেন, “নির্বাচনের আরেকটি ধাপ এড়াতে আমাদের সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের “উন্মুক্ত মন নিয়ে” আলোচনায় আসার আহ্বান জানান।