ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাগ্য এখন অনেকাংশেই নির্ভর করছে দেশটির আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধী শিবিরের সমঝোতার ওপর। যদি আরব দলগুলোর সঙ্গে একটি কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তবে বিরোধীরা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ পাবে। তবে এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিরোধী শিবিরের ভেতরেই একটি অংশের তীব্র আপত্তি রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ভোট ও আসন পাওয়া আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হবে কি না, সেই কঠিন সিদ্ধান্ত এখন নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের সামনে।
গাজায় জাতি নিধন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং লাখো ফিলিস্তিনির বাস্তুচ্যুতির মতো চরম সংকটের প্রেক্ষাপটে গত মঙ্গলবার ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই প্রতিবেদনের সময় ভোট গণনা প্রক্রিয়া চলছিল। তবে বুথফেরত জরিপ এবং আংশিক গণনার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যে, নেতানিয়াহু কিংবা তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের জোট—কোনোটিরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার তেমন আভাস নেই।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত ৮৫ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। এই গণনার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি, আইজেনকটের জোট ৪৮টি এবং আরব দলগুলো ১৯টি আসন পেতে পারে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়া গেলে বিরোধীরা খুব সহজেই এই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে। ফলে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার পাশাপাশি ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সামনে এসেছে।
আরব ভোটের গুরুত্ব ও প্রভাব
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি হলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক। এবারের নির্বাচনে তাঁদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রাআমের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বর্ণবাদের ক্ষোভ অনেক আরব নাগরিককে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
সারা দেশে এবার ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। অতি ডানপন্থীদের সঙ্গে নেতানিয়াহুর জোট গঠন এবং কট্টর ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল, যা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
এই ব্যাপক জনঅংশগ্রহণকে সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে ‘ইহুদি–আরব প্রকৃত অংশীদারত্ব’–এর আহ্বান জানিয়েছেন জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমকে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “নেতানিয়াহুর বিকল্প গড়তে চাইলে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
তবে এই সমঝোতার ধরন কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ দিতে পারে অথবা বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েও সরকার গঠন করতে সাহায্য করতে পারে। তবে যে পথেই আলোচনা আগানো হোক না কেন, দলগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ ও অবস্থান বিবেচনা করে সমঝোতা করতে হবে।
বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ আপত্তি ও সমালোচনা
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গাদি আইজেনকটের শিবিরের অনেক সদস্য আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের উদ্যোগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। ফলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাওয়া দুই পক্ষের মধ্যে এই সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে।
‘দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ বইয়ের লেখক অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইন আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, এই অনীহার মূলে রয়েছে গভীর আরববিদ্বেষ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, গণতন্ত্রের দাবি করা কোনো দেশে সরকারে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি মেনে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে এমন বিতর্ক কেন হয়?
হারেৎজ–এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আরব নাগরিকেরা দীর্ঘ বর্জনের পরিবেশ কাটিয়ে এবার ভোট দিয়েছেন। এখন যদি তাঁদের আবারও প্রত্যাখ্যাত করা হয়, তবে নিজেদের ‘গণতান্ত্রিক’ বলে দাবি করা শিবিরের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইউসুফ জাবারিন তাঁর দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, “আমরা ইহুদি-আরব প্রকৃত অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। নেতানিয়াহুর বিকল্প গড়তে চাইলে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”
সহযোগিতার আহ্বান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
যদিও বিরোধী শিবিরের সবাই একমত নন, তবে ডেমোক্র্যাটস দলের আইনপ্রণেতা গিলাদ কারিভ আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দেশের যে ‘ধ্বংসাত্মক’ গতিপথ চলছে, তা ঠেকাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে কারিভ লিখেছেন যে, উদারপন্থী ইহুদি এবং আরব জনগোষ্ঠী—উভয় ক্ষেত্রেই বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। তাঁর দাবি, বিপুলসংখ্যক মানুষ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন এবং তাঁদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য এখন একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
তবে এই সহযোগিতার চেষ্টার পাশাপাশি ফিলিস্তিন ইস্যুতে দলগুলোর অবস্থান একটি বড় বাধা। রয়টার্সের তথ্যমতে, প্রায় সব ইহুদি দলই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী। ফলে নেতানিয়াহুর বিদায় এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে নীতিগত পরিবর্তন—এই দুটি বিষয় এক নয়।
ভোটের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করবেন। নিয়ম অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতাই যে সরকার গড়বেন, তা বাধ্যতামূলক নয়; বরং কার সরকার গড়ার সম্ভাবনা বেশি, সেটিই হবে বিবেচ্য।
নতুন নির্বাচন এড়াতে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটকে নিয়ে একটি ঐক্যের সরকারের সম্ভাবনাও খোলা রেখেছেন প্রেসিডেন্ট হারজোগ। তবে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তবে পুনরায় নির্বাচন হতে পারে। নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।