বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মধুর ব্যবহার অনেক বেড়েছে। তবে বাজার থেকে মধু কেনার ক্ষেত্রে এর বিশুদ্ধতা, গুণগত মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত যে, কেবল রং, ঘনত্ব কিংবা স্বাদ দেখে খাঁটি মধু চেনা সম্ভব; কিন্তু বাস্তবে তা সঠিক নয়।

১. লেবেল ও মান যাচাই করুন
বোতলজাত মধু ক্রয়ের সময় বোতলের লেবেল, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদের তারিখ এবং প্রস্তুতকারকের বিস্তারিত পরিচয় ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি বোতলের সিলটি অক্ষত কি না তা দেখে নিন। উপাদানের তালিকায় বাড়তি চিনি বা অন্য কোনো কৃত্রিম মিষ্টিকারকের উপস্থিতি আছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। তবে মনে রাখা জরুরি যে, মধুতে প্রাকৃতিকভাবেই গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ থাকে। তাই উপাদানে শর্করার উল্লেখ থাকলেই যে মধুটি ভেজাল, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।

২. রং ও ঘনত্বে বিভ্রান্ত হবেন না
মধুর রং প্রায় বর্ণহীন থেকে শুরু করে গাঢ় বাদামি পর্যন্ত হতে পারে। যে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়, তার উৎসের ওপর ভিত্তি করে মধুর ঘ্রাণ, স্বাদ এবং ঘনত্বের তারতম্য ঘটে। অনেকে মনে করেন গাঢ় রঙের মধু বেশি খাঁটি কিংবা ঘন মধু মানেই ভালো এবং পাতলা মধু মানেই ভেজাল—কিন্তু এই ধারণার কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে মধুতে যদি অস্বাভাবিক গন্ধ, অতিরিক্ত ফেনা কিংবা গাঁজনের কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তবে তা থেকে সতর্ক থাকা উচিত।

৩. মধু জমে যাওয়া কি ভেজালের লক্ষণ?
অনেকে মনে করেন মধু জমে গেলে তা ভেজাল। আসলে তা নয়। মধুতে দানাদার স্ফটিক তৈরি হওয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় 'ক্রিস্টালাইজেশন' বলা হয়, যা একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

৪. ঘরোয়া পরীক্ষায় আস্থা নয়
সাধারণত প্রচলিত কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি যেমন—পানিতে মধু ফেলে দেখা, আঙুলে ঘনত্ব পরীক্ষা করা কিংবা আগুন দিয়ে পরীক্ষা করার মাধ্যমে মধুর বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা যায় না। ভেজাল শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষাগারে উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

৫. খোলা মধু কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন
বাজারে খোলা মধু বিক্রির সময় বিক্রেতারা অনেক সময় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, মৌচাক থেকে সরাসরি সংগ্রহের দাবি কিংবা নানা রকম স্বাস্থ্যগুণের কথা বলে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করেন। তবে মনে রাখতে হবে, এই ধরনের মৌখিক দাবি মধুর বিশুদ্ধতার কোনো প্রমাণ দেয় না।

৬. পুষ্টিগুণ থাকলেও পরিমিত খান
মধু মূলত শর্করা ও শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে; একে সব রোগের মহৌষধ মনে করা ভুল। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধু খাওয়ার পরিমাণ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে, কারণ এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১২ মাসের কম বয়সী শিশুদের কোনোভাবেই মধু দেওয়া যাবে না। খাঁটি মধুতেও বটুলিজমের জীবাণুর স্পোর থাকতে পারে, যা ছোট শিশুদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা প্রতিদিন নিরাপদে ১ থেকে ২ টেবিল চামচ মধু খেতে পারেন।

তথ্যসূত্র: ফারজানা কান্তা, ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট অ্যান্ড ডায়েটিশিয়ান, ওবেসিটি ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট, আনোয়ার খান মডার্ন হসপিটাল, বনানী, ঢাকা।