আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে ৯৫ শতাংশ বয়স্ক ব্যক্তির বেশির ভাগই একাধিক স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগেন, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।

গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি, পুষ্টিকর খাদ্য এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে মানুষের আয়ু বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের গড় আয়ু ৭২.৪ বছর। অন্যদিকে, জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন বলে, বাংলাদেশে পুরুষদের গড় আয়ু ৭৪ বছর এবং নারীদের ৭৭ বছর।

৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের হার দেশে ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সকে প্রবীণ হিসেবে গণনা করলে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর হার ৯.৫ ভাগ, অর্থাৎ ১ কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে বেশিরভাগ বয়স্ক মানুষ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কম। এছাড়া একাকী প্রবীণদের সংখ্যাও বেড়ে যাওয়ায় তাদের যত্ন নেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতিসংঘ ১৯৯১ সাল থেকে প্রবীণদের সুরক্ষা, বার্ধক্যজনিত সমস্যা এবং অধিকার নিশ্চিত করতে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। এই বছর বাংলাদেশ সরকার প্রবীণ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’।

এই বিশেষ গোষ্ঠীকে সুস্থ রাখতে জেরিয়াট্রিক কেয়ার বা বয়স্ক স্বাস্থ্যসেবা এখন সময়ের দাবি। জেরিয়াট্রিক সিনড্রোমে মানবদেহের সামষ্টিক কার্যক্ষমতার ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা দেখা দেয়। বয়োবৃদ্ধ রোগীরা সাধারণত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বৈকল্য, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, হাড়ক্ষয়, স্মৃতিভ্রষ্টতা, ইনফেকশন, অপুষ্টি, ক্যানসার এবং প্রস্রাব–পায়খানা ধরে রাখতে না পারাসহ বহু রোগে ভোগেন। তাই তাদের চিকিৎসায় বিশেষ যত্ন ও ভালোবাসা প্রয়োজন; সাধারণ রোগীদের মতো সেবা দেওয়া যথেষ্ট নয়।

বিবিসি বাংলা ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি তালিকা অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি প্রবীণ মারা যান হৃদ্‌রোগে। দ্বিতীয় শীর্ষ কারণ ব্রেন স্ট্রোক, তৃতীয় শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, এরপর ডায়াবেটিস ও কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা।

বয়স্কদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নিয়মতান্ত্রিক হতে হবে। সুষম ও সহজপাচ্য খাদ্য, পরিমিত শরীরচর্চা, দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম এবং নিয়মিত হেলথ চেকআপ করা জরুরি। পুষ্টিবিদদের পরামর্শে খাদ্যাভ্যাস এবং ফিজিওথেরাপিতে মনোযোগ দেওয়া উচিত। প্রবীণদের ঘুমের ওষুধ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে, নাহলে জটিলতা বাড়তে পারে।

পেশিক্ষয় রোধে যথেষ্ট প্রোটিন প্রয়োজন। মাছ, ডিম, সবজি, ফলমূল, আঁশ–জাতীয় খাবার, বাদাম এবং ভিটামিন খাদ্যাভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বি–জাতীয় খাবার বর্জন করা উচিত। হাড়ক্ষয় রোধে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ জরুরি। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ২টার মধ্যে সূর্যের আলো গায়ে মাখা, দুধ বা টক দই খাওয়া উপকারী।

অনেকে অভ্যাসের কারণে দিনের পর দিন বাড়িতে থাকা বয়স্ক মানুষটিকে বিশেষভাবে খেয়াল করেন না। নিজের কাজের ব্যস্ততায় বয়স্ক মা-বাবার কাছে বসে কথা বলা জরুরি মনে না করায় তারা একাকিত্বে ভোগেন। শুধু নিয়মিত ওষুধ কিনে দেওয়ায় কর্তব্য শেষ নয়; বয়স্ক ব্যক্তিরা যাতে নিজেকে অবহেলিত মনে না করেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় থাকলে মানসিক অবসাদ কমে যায়। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও শিশুদের সঙ্গে সময় কাটালে প্রবীণদের মন ভালো থাকে। প্রতিদিন কিছুটা সময় গল্প করা এবং শিশুদের প্রয়োজন শোনা জরুরি।

নিয়মিত শহরের ছাদবাগান বা পার্কে নিয়ে গেলে প্রবীণেরা আনন্দিত হন। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, কেয়ার হোম, হসপিস সেন্টার ইত্যাদির মাধ্যমে কম্প্রিহেনসিভ জেরিয়াট্রিক কেয়ার সার্ভিস প্রদান করা উচিত।

বয়স্কদের আবাসস্থলের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত আলো–বাতাস, পিচ্ছিল নয় এমন মেঝে ও সিঁড়ি, টয়লেটে রেলিং এবং অ্যান্টি-স্লিপ ম্যাট ব্যবহার মেঝে শুকনা রাখতে সাহায্য করে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করে।

ডা. শামীমা শারমীন, সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন, বিআইএইচএম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা