সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার মুরারিকাটি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির টালি এখন আর কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় মাটি ও দক্ষ কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এই টালিগুলো এখন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রপ্তানি হচ্ছে। টেকসই গুণমান এবং নান্দনিক নকশার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ সমাদর পাচ্ছে এই পণ্যগুলো।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০২ সাল থেকে মুরারিকাটি গ্রামে পোড়ামাটির টালি তৈরির কাজ শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বর্তমানে এখানকার কারখানায় বিভিন্ন শৈল্পিক নকশার ফ্লোর ও ওয়াল টালি তৈরি করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ স্থানীয় মাটি ব্যবহার করে প্রস্তুত করা এই পণ্যগুলো একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছে।

টালি তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য। প্রথমে মাটি সংগ্রহ করে তা কাদায় রূপান্তর করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে প্রয়োজনীয় আকৃতি দেওয়া হয়। কয়েক দিন ধরে শুকানোর পর বিশেষ চুল্লিতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে পোড়ানো হয় এই টালিগুলো। সবশেষে কঠোর মান যাচাই-বাছাইয়ের পর এগুলো বাজারজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই টালিগুলো রপ্তানি করা হচ্ছে। এই শিল্পের প্রসারের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কারিগর, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং পরিবহন খাতের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এই শিল্পের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।

উদ্যোক্তাদের মতে, মুরারিকাটি গ্রামের মাটির বিশেষ গুণগত মান এবং কারিগরদের অসাধারণ দক্ষতার কারণেই এখানকার টালিগুলো অধিক টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন হয়। বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় নকশার কারণে বিদেশের বাজারে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে তারা মনে করেন, এই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি নাসিম ফারুক খান মিঠু বলেন, “কলারোয়ার হাতে তৈরি টালি দেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের বাজারে এ পণ্যের সম্ভাবনা রয়েছে। যথাযথ সহযোগিতা পেলে উৎপাদন ও রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।”

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সাতক্ষীরা কার্যালয়ের কর্মকর্তা গৌরব দাস জানান, “উদ্যোক্তারা চাইলে প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও উৎপাদন উন্নয়নে সহযোগিতা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারের ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় এ ধরনের সম্ভাবনাময় শিল্পের বিকাশে কাজ করা হচ্ছে।”