সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত শিল্পনগরী কর্মকর্তা মো. আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রধান শিক্ষকের স্ত্রীর বড় ভাই হওয়ার সুবাদে জগদল আল ফারুক দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনীত হওয়ার পর তিনি মোটরসাইকেল শোডাউন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগটি তিনি অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যানুসারে, দিরাই উপজেলার জগদল আল ফারুক দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে আবুল কাশেম মনোনীত হন। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয়। সেই সময় মাটিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে জগদল বাজার পর্যন্ত তার আত্মীয়স্বজনেরা মোটরসাইকেল শোডাউন করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই মোটরসাইকেল শোডাউনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। উক্ত ভিডিওতে দেখা যায়, আবুল কাশেমকে ফুলের মালা পরিয়ে দিচ্ছেন তার চাচাতো ভাই শাহ রাফিক আলী এবং যুবদল নেতা আব্দুল আমিন বকুল। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন মোটরসাইকেল শোডাউনের ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর সিলেট শিক্ষা বোর্ড জগদল আল ফারুক দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির এডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে আবুল কাশেমের নাম অনুমোদন করে।
এই বিষয়ে আবুল কাশেম দাবি করেন, “জগদল গ্রামে আমার বাড়ি। আমি বাড়িতে গিয়েছিলাম। কোনো ধরনের শোডাউন করিনি। আমার আত্মীয়স্বজনেরা আমাকে এগিয়ে নিয়েছেন। কোনো শোডাউন বা আয়োজন ছিল না। এলাকার কিছু মানুষ এসব রটাচ্ছেন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “স্কুলের কমিটি গঠন নিয়ে একাধিক অভিযোগ ছিল। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হওয়ার পর আমার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। সংসদ সদস্য ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিয়েছেন। এরপর কমিটি অনুমোদন হয়েছে। এখন যা হচ্ছে, আগে জানলে আমি এই কমিটিতে থাকতাম না।”
অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ যে, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল পাশা তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের নাম সভাপতি হিসেবে প্রস্তাব করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়। এছাড়া প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসক এবং শিক্ষা বোর্ডের পরিচালকের কাছেও আবেদন করা হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, তারা একটি বৈঠকের মাধ্যমে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে সাবেক শিক্ষক ধীমান চৌধুরী, সাবেক সভাপতি আব্দুল লতিফ এবং আফজাল হোসেনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফের নাম বাদ দিয়ে তার স্ত্রীর বড় ভাই আবুল কাশেমের নাম যুক্ত করেন এবং স্থানীয়দের অন্ধকারে রেখেই কমিটি অনুমোদন করিয়ে আনেন।
জগদল গ্রামের বাসিন্দা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, “এলাকাবাসীর প্রথম প্রস্তাব ছিল অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ধীমান চৌধুরীর নাম। দ্বিতীয় প্রস্তাবে আমার নাম ও তৃতীয় প্রস্তাবে আফজাল হোসেনের নাম ছিল। কিন্তু প্রধান শিক্ষক পক্ষপাতিত্ব করে আমার নাম বাদ দিয়ে তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের নাম যুক্ত করেছেন। তিনি নিজের এলাকার শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কমিটির অনুমোদন করিয়ে এনেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “কমিটি গঠন নিয়ে এলাকার লোকজন জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ করেছিলেন। সরেজমিনে তদন্ত করে কমিটি অনুমোদনের জন্য শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে প্রধান শিক্ষক গোপনে কমিটি অনুমোদন করিয়ে এনেছেন। সভাপতি মনোনীত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধির মতো এলাকায় মোটরসাইকেল শোডাউন করায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।”
এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা কামাল পাশা জানান, “আমি কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করিনি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর প্রস্তাবে আব্দুল লতিফের নাম ছিল না। বিধি অনুযায়ী, আমি তিনজনের নাম প্রস্তাব করতে পারি। সংসদ সদস্যও ডিও লেটার দিয়েছেন। এরপর শিক্ষা বোর্ড থেকে কমিটির অনুমোদন হয়েছে।”
জগদল গ্রামের বাসিন্দা ও ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক হাজী সমুজ মিয়া বলেন, “এলাকাবাসী বসে সভাপতি পদে ধীমান চৌধুরী, আব্দুল লতিফ ও আফজাল হোসেনের নাম প্রস্তাব করেছিল। প্রস্তাবে আবুল কাশেমের নাম ছিল না। কিন্তু প্রধান শিক্ষক চালাকি করে আব্দুল লতিফের নামের জায়গায় তার স্ত্রীর বড় ভাই আবুল কাশেমের নাম দিয়ে বোর্ড থেকে কমিটি অনুমোদন করিয়ে এনেছেন।”
সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক এম এন এম আসিফ এই বিষয়ে জানান, আবুল কাশেমের স্কুল কমিটির সভাপতি হওয়া বা মোটরসাইকেল শোডাউনের বিষয়ে তার কোনো জানা নেই। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেননি বা তাকে কিছু জানাননি। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।