যশোর জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক তানভীরুল ইসলাম সোহান। মুক্তকণ্ঠর যশোর প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম তাঁর সাথে এই বিশেষ সাক্ষাৎকারের আয়োজন করেন।
এত বিপুল যোগাযোগসুবিধা থাকা সত্ত্বেও যশোর কেন প্রত্যাশিত শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারেনি, সেই প্রশ্নের জবাবে তানভীরুল ইসলাম সোহান বলেন, “যশোর প্রাচীন শহর। অবকাঠামোগত সম্ভাবনা ও ভৌগোলিক সুবিধার দিক থেকে এটি অনন্য। তবে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ অপরিহার্য। কিন্তু যশোরে সেই নিশ্চয়তা নেই। ফলে ভারী শিল্পের বিনিয়োগকারীরা এখানে আকৃষ্ট হননি।”
নওয়াপাড়া নদীবন্দরকে কার্যকর করার উপায় সম্পর্কে তিনি জানান, ভৈরব নদের নাব্যতা সংকট এবং অবকাঠামোগত আধুনিকায়নের অভাবই এই বন্দরের প্রধান অন্তরায়। বন্দর সংলগ্ন একটি সেতুর পিলারের গোড়ায় বালু ও পলি জমে নদের নাব্যতা কমেছে, যার ফলে মোংলা থেকে পণ্যবাহী কার্গো নওয়াপাড়ায় পৌঁছাতে পারছে না। এই সমস্যা সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তিতে নিয়মিত ড্রেজিং করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তানভীরুল ইসলাম বলেন, “সেই সঙ্গে আধুনিক ক্রেন ও পণ্য খালাসের সুবিধা এবং ঘাট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের খরচ ৪০-৫০ শতাংশ কমবে।”
যশোর বিমানবন্দরের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, একসময় যশোর থেকে কক্সবাজারে বিমান চলাচলের সময় সেখান থেকে প্রচুর চিংড়ির রেনুপোনা যশোরে আনা হতো, যা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ সংগ্রহ করতেন। কিন্তু ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় রেনুপোনা আসার পরিমাণ অনেক কমেছে। পাশাপাশি যশোর-ঢাকা পথেও বিমান চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। এই বিষয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের দাবি, “যশোর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হোক। এ অঞ্চলে প্রচুর শাকসবজি, ফুল ও পোনা মাছ উৎপাদিত হয়। কার্গো সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক হাব হিসেবে বিমানবন্দরটি গড়ে তোলা গেলে কৃষি ও পচনশীল পণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানি সম্ভব হবে।”
সরকারের সাথে এই বিষয়ে আলোচনার বিষয়ে তিনি জানান, যশোরের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে দেখা করে তিনি মৌখিকভাবে বিষয়গুলো জানিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে নির্বাচনী জনসভাতেও এই বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রস্তাবিত কনটেইনার টার্মিনালের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে তানভীরুল ইসলাম সোহান বলেন, রূপদিয়ায় সমন্বিত কনটেইনার টার্মিনাল স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। রেলওয়ে বাংলাদেশের মহাপরিচালক একবার স্থানটি পরিদর্শন করলেও এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। তিনি মনে করেন, এই টার্মিনালটি স্থাপিত হলে ভারত ও বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি এবং অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং খরচ কমবে। বেনাপোলে জায়গার সংকটের কারণে যশোরে টার্মিনাল হলে খুলনা ও মোংলাও উপকৃত হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে রেলপথে আসা কনটেইনার কমলাপুর স্টেশনে খালাসের পর পুনরায় জাহাজে করে ভারতে পাঠাতে হয়। তাঁর মতে, “যশোরে টার্মিনাল হলে এই অতিরিক্ত খরচ এড়ানো সম্ভব হবে। এতে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমবে।”
যশোরে অটোমোবাইল পার্ক ও নতুন ইপিজেডের অবস্থা সম্পর্কে তিনি জানান, সুতিঘাটায় অটোমোবাইল পার্কের জন্য জমি চিহ্নিত করা হলেও সরকারি অনুমোদন, তহবিল ও অবকাঠামোর অভাবে প্রকল্পটি স্থবির হয়ে আছে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর বর্তমানে প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন ও একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন বিসিক স্থাপনে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত তৎপর রয়েছেন এবং নতুন ইপিজেডের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে স্থানীয় কাঁচামাল ও সস্তা শ্রমের সঠিক ব্যবহার হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পুরোনো বিসিক শিল্পনগরীকে পুনরায় সচল করার উপায় নিয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের অভাব থাকায় বিদ্যুৎ দিয়ে উৎপাদন করতে হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া বিসিকের ব্যবসায়ীরা বন্ড সুবিধাও পান না। উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে অনেক উদ্যোক্তা দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। তাই রুগ্ণ শিল্প পুনর্বাসনে সহজ শর্তে ঋণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি রাস্তাঘাটের করুণ দশা এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টিতে পানি জমে যায়। তাই বরাদ্দ বাড়িয়ে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।