আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে ১০ নম্বর জার্সিটি কেবল একটি সংখ্যার সমষ্টি নয়, বরং এটি এক বিশাল ঐতিহ্যের প্রতীক। এই জার্সির সঙ্গে মিশে আছে কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদু এবং লিওনেল মেসির লেখা এক মহাকাব্য। আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে ১০ নম্বর জার্সি মানেই এক বিশেষ মর্যাদা। আপাতদৃষ্টিতে এটি কাপড়ের ওপর সেলাই করা একটি সাধারণ সংখ্যা মনে হলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রত্যাশার ভার পাহাড়সম।
গত আগস্ট মাসে লিওনেল মেসি জাতীয় দলের জার্সি ছেড়ে অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই ফুটবল অঙ্গনে একটি বড় প্রশ্ন দানা বেঁধেছে। মেসির সেই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি হিসেবে কে জায়গা করে নেবেন?
ফুটবল বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এই পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী নিকো পাজ। তবে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর পছন্দ ভিন্ন। তিনি মনে করেন, এই জার্সির দাবিদার হুলিয়ান আলভারেজ।
তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, অধিনায়ক রোমেরো যাঁকে এই জার্সির জন্য যোগ্য মনে করছেন, সেই আলভারেজ নিজেই নাকি এই জার্সি পরতে আগ্রহী নন। আর্জেন্টিনার দুই সাংবাদিক ভাই এস্তেবান এদুল ও গাস্তন এদুলের পরিচালিত ‘লস এদুল’ নামক ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোমেরো বলেন, ‘আমার মতে, হুলিয়ানের ১০ নম্বর পরা উচিত। তাকে এটা আমি এরই মধ্যে বলেছি। কিন্তু সে বর্তমান নম্বর নিয়েই চালিয়ে যেতে চায়।’
বর্তমানে আলভারেজ আর্জেন্টিনার ৯ নম্বর জার্সি পরিধান করেন। ঐতিহাসিকভাবে আর্জেন্টাইন ফুটবলে ১০ নম্বর জার্সিটি দেওয়া হয় সেই প্লেমেকারদের, যাঁরা কেবল গোল করার দক্ষতাই রাখেন না, বরং সতীর্থদের গোল করতে সহায়তা করে পুরো আক্রমণের পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করেন। আলভারেজ মূলত একজন গোলশিকারি হিসেবে পরিচিত। তবে বড় ম্যাচে তাঁর পারফর্ম করার ক্ষমতা অনস্বীকার্য। আর্জেন্টিনার ৯ নম্বর জার্সি গায়ে তিনি ইতিমধ্যে ১৬টি গোল করেছেন। সর্বশেষ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ১১২ মিনিটে জয়সূচক গোল করে ম্যাচসেরার মুকুট জিতেছিলেন তিনি।
আলভারেজকে কেন মেসির উত্তরসূরি হিসেবে দেখতে চান রোমেরো? এই বিষয়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়কের ব্যাখ্যা, ‘ওর মধ্যে সেই বিনয়, পারিবারিক মনোভাব ও ভালো মানুষ হওয়ার সব গুণ স্পষ্ট। যোগ্যতা ওর পুরাই আছে। আমার মনে হয়, জাতীয় দলে এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার রয়েছে আমাদের।’
আলভারেজের এই অনাগ্রহের পেছনে নিকো পাজের দ্রুত উত্থানের কোনো প্রভাব আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। তবে ২২ বছর বয়সী এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের বর্তমান ফর্ম উপেক্ষা করা অসম্ভব।
গত মঙ্গলবার রাতে ইতালিয়ান সিরি আ-তে তোরিনোর বিপক্ষে লড়াইয়ে ২৪ মিনিটে পিছিয়ে পড়েছিল কোমো। সেই ম্যাচে একটি গোল করে এবং আরেকটি গোলে সহায়তা করে দলকে জয় এনে দেন পাজ।
কেবল এই ম্যাচই নয়, ২০ অক্টোবর রাতে চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে কোমোর ৪-১ গোলের বড় জয়েও দুর্দান্ত ভূমিকা পালন করেছেন এই আর্জেন্টাইন তরুণ। ওই ম্যাচে তিনি নিজে দুটি গোল করেন এবং একটি গোলে সহায়তা করেন। চলতি মৌসুমে সব ধরনের প্রতিযোগিতার ১১ ম্যাচে পাজের ব্যক্তিগত গোল ৫টি এবং অ্যাসিস্ট ৬টি। অন্যদিকে, আলভারেজ ৯ ম্যাচে ২ গোল করার পাশাপাশি ২টিতে সহায়তা করেছেন।
পরিসংখ্যানের হিসেবে পাজ কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, তাঁর খেলার ধরনটি বিশেষভাবে মেসিকে মনে করিয়ে দেয়। দুজনেই বাঁ পায়ের প্লেমেকার। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফাঁক খুঁজে বের করতে পাজ পুরো মাঠ জুড়ে ঘুরে বেড়ান। ফ্রি-কিক নেওয়ার ভঙ্গি এবং শট মারার কৌশলেও মেসির ছায়া দেখা যায় তাঁর খেলায়।
একদিকে আলভারেজের সহজাত গোল করার ক্ষমতা ও বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে পাজের সৃজনশীলতা ও বাঁ পায়ের জাদু। অধিনায়ক রোমেরোর সমর্থন আলভারেজের পক্ষে থাকলেও, আলভারেজ নিজেই ৯ নম্বর জার্সিতে সন্তুষ্ট। ফলে মেসির রেখে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সিটি এখনো তার যোগ্য উত্তরাধিকারীর অপেক্ষায় রয়েছে।