মঞ্চে পা রাখতেই চারদিক থেকে ভেসে এল ‘মেসি-মেসি’ ধ্বনি। গ্যালারিতে উড়ছিল আর্জেন্টিনার পতাকা, আর দর্শকদের পরনে ছিল নীল-সাদা জার্সি। প্রিয় ফুটবল তারকাকে সামনে পেয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল হাজারো শিশু-কিশোর। স্পেনের ওভিয়েদো শহরে এমনই এক রাজকীয় সংবর্ধনা পেলেন লিওনেল মেসি। প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কার গ্রহণ করতে স্পেনে আসা এই আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে ঘিরে পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেলে ওভিয়েদোর প্যালাসিও দে লোস দেপোর্তেসে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন মেসি। সেখানে প্রায় ছয় হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন, যাদের মধ্যে বড় একটি অংশই ছিল শিশু ও কিশোর। মেসি মঞ্চে উঠতেই করতালি ও উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্রীড়াঙ্গন। শিশুদের এমন অকুণ্ঠ ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে মেসি বলেন, ‘অনেক দিন পর স্পেনে এসে আবারও এত ভালোবাসা পাওয়া সত্যিই অনেক আনন্দের। আপনাদের সঙ্গে এখানে থাকতে পারাটা আমার জন্য সৌভাগ্যের। আশা করি, একসঙ্গে সময়টা ভালো কাটবে।’

মূলত প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ফাউন্ডেশনের ‘তোমা লা পালাব্রা’ নামক একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়। এই কর্মসূচির অধীনে ‘এল হুয়েগো দেল দিয়েস’ বা ‘দশ নম্বরের খেলা’ নামের একটি বিশেষ কার্যক্রমে আস্তুরিয়াস অঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। মেসির ফুটবলজীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা খেলাটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, আনন্দদায়ক ও সম্মানজনক করে তুলতে নতুন কিছু নিয়ম প্রণয়ন করেছিল।

শিক্ষার্থীরা ফুটবলের জন্য মোট নয়টি নিয়ম তৈরি করলেও দশম নিয়মটি নির্ধারণ করার দায়িত্বটি মেসির জন্য রাখা হয়েছিল। সেই বিশেষ নিয়ম হিসেবে আর্জেন্টাইন তারকা বলেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ফুটবল উপভোগ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ফুটবল কেবল জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, বরং এটি আনন্দ দেয়, বন্ধুত্ব তৈরি করে এবং মানুষকে এক সূত্রে বাঁধে।

শুধুমাত্র জয়ের পেছনে ছুটতে গিয়ে খেলার সহজাত আনন্দ হারিয়ে না ফেলার পরামর্শও দেন মেসি। তার মতে, ছোট খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের উচ্চ প্রত্যাশা শিশুদের স্বাভাবিকভাবে খেলতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বলে তিনি মনে করেন।

নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন ইন্টার মায়ামির এই তারকা। বার্সেলোনায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোতে রোনালদিনিয়ো এবং স্যামুয়েল ইতোর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে খেলার স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি। মেসি জানান, স্বভাবগতভাবে কিছুটা লাজুক হওয়ায় শুরুতে তাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে সতীর্থদের নিরন্তর উৎসাহ তাঁকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।

অনুষ্ঠানে মেসির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার সান্তি কাজোরলা। বার্সেলোনার বিপক্ষে খেলার স্মৃতিচারণা করে তিনি জানান, প্রতিপক্ষ হিসেবে মেসিকে সামলানো অত্যন্ত কঠিন হলেও তার বিপক্ষে খেলতে তিনি সব সময়ই আগ্রহী ছিলেন। কারণ সেরা ফুটবলারদের বিপক্ষে খেলা একজন খেলোয়াড়ের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আরও একটি স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করেন মেসি। প্রতিবন্ধী ফুটবলারদের জন্য আয়োজিত লা লিগা জেনুইন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া রিয়াল ওভিয়েদো ও স্পোর্টিং গিজনের দুই খেলোয়াড়ের সঙ্গে মঞ্চে বল নিয়ে খেলেন তিনি। মেসির দেওয়া পাস থেকে গোলও করেন তাঁদের একজন, যা দর্শকদের আবারও উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দেয়।

মেসিকে একনজর দেখার আকুলতা ছিল এতটাই প্রবল যে, সাধারণ দর্শকদের জন্য বরাদ্দ ৪ হাজার ৭০০টি টিকিট মাত্র ১৩ মিনিটেই শেষ হয়ে যায়। টিকিট সংগ্রহের জন্য একপর্যায়ে অনলাইনে ১৬ হাজারের বেশি মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন।

এবারের প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন মেসি। ফুটবলে অসামান্য সাফল্যের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় তার বিশেষ অবদানকেও স্বীকৃতি দিয়েছে পুরস্কার কর্তৃপক্ষ।

আজ শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ওভিয়েদোর তিয়াত্রো কাম্পোয়ামোরে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারটি গ্রহণ করবেন মেসি। তার আগের দিন হাজারো শিশুর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে স্পেন সফরকে স্মরণীয় করে রাখলেন এই আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি।