বেনিনের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত ম্যাচে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেছে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে সেদিন দুজন লিওনেল খেলেছেন। একজন বিশ্বফুটবলের কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, যাঁর জন্য ম্যাচটি ছিল এক বিদায়ী মুহূর্ত। আর অন্যজন হলেন তরুণ লিওনেল ফ্লোরেস। একজন যেখানে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক হিসেবে কোটি কোটি মানুষের স্মৃতি ও পোস্টারে অমর হয়ে আছেন, অন্যজন সেখানে মাত্র ১৮ বছরের এক কিশোর, যাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের পরিচিতি কেবল শুরু হয়েছে।
লিওনেল ফ্লোরেসের উত্থানটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বোকা জুনিয়র্সের দ্বিতীয় দল থেকে সরাসরি জায়গা করে নিয়েছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে। এই দ্রুত উত্থানেরই প্রমাণ মেলে মেসির বিদায়ী ম্যাচে, যেখানে বদলি হিসেবে নেমে তিনি প্রায় পনেরো মিনিট মাঠে খেলার সুযোগ পান।
২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুয়েনস এইরেসের উত্তরের অত্যন্ত দরিদ্র এলাকা ভিয়া লা কাভার একটি বস্তিতে জন্ম লিওনেল বেনজামিন ফ্লোরেসের। তবে পরিচিতির ক্ষেত্রে ‘লিও’ বা ‘ফ্লোরেস’ নামের চেয়ে সবাই তাঁকে ‘বেনজা’ নামেই বেশি চেনেন।
ফ্লোরেসের সহজাত প্রতিভা খুব অল্প বয়সেই বোকা জুনিয়র্সের স্কাউটদের নজরে পড়ে। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি বোকা জুনিয়র্সের একাডেমিতে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ ১০ বছর ধরে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে বাসে করে অনুশীলনে যাওয়ার এক কঠোর পরিশ্রমের জীবন কাটে তাঁর। শৈশবের অনেকটা সময় ব্যয় করেছেন কেবল নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে।
ধীরে ধীরে সেই পরিশ্রমের ফল পেতে শুরু করেন তিনি। একাডেমির প্রতিটি স্তর পার হয়ে এক ম্যাচে পাঁচ গোল করার রেকর্ড গড়েন তিনি। এমনকি কর্নার থেকে সরাসরি গোল করার সক্ষমতা দেখান, যাকে ফুটবলের ভাষায় ‘অলিম্পিক গোল’ বলা হয়। সেই ছোট্ট ছেলেটি তখন জানতেন না, ভোরের সেই বাস যাত্রা তাঁকে একদিন জাতীয় দলের আঙিনায় পৌঁছে দেবে।
গত জুলাই মাসে বোকার কোচ আরুয়াবারেনা তাঁকে প্রথম দলের অভিষেক করান এবং মাঠে নেমে গোল করে সেই আস্থার যথাযথ প্রতিদান দেন এই কিশোর। এরপর সেপ্টেম্বরেই জাতীয় দলের ডাক পান তিনি। কোচ স্কালোনি বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে বদলি হিসেবে মাঠে নামান।
পরবর্তী সাত দিন যেন তাঁর জন্য রূপকথার মতো ছিল। বলিভিয়ার বিপক্ষে আলবিসেলেস্তের হয়ে অভিষেক, এরপর বোকায় ফিরে উনিয়ন দে সান্তা ফের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হয়ে জোড়া গোল। এরপর পুনরায় জাতীয় দলের হয়ে বুরকিনা ফাসো ও বেনিনের বিপক্ষে খেলা। মাত্র সাত দিনে চার ম্যাচে মাঠে নামেন তিনি।
১৮ বছর বয়সী এক তরুণের শরীরে এত চাপ নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে তাঁর প্রথম কোচ ক্রিস্তিয়ান বেনিতেস আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ওলেকে জানিয়েছেন, এই ধকল তিনি আগে থেকেই সয়েছেন। বেনিতেস বলেন, “সান ইসিদ্রোর পাড়ার ক্লাব এল সোরসালে পাঁচ বছর বয়সেই ছেলেটি ওভারহেড কিক করত। অনুশীলনে আমার ছেলে বল ছুড়ে দিত আর ও ওভারহেড কিক করত। সব বল জালে জড়াত।”
ফ্লোরেসের প্রতি নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গিয়ে বেনিতেস আরও বলেন, “আমি রিভার প্লেটের সমর্থক। কিন্তু এখন বোকার ম্যাচ দেখি। ভাবুন, আমার কেমন লাগে। আমি দেখি ওর জন্য। এখন ওর গোলে আমিও উদ্যাপন করি।” রসিকতা করে তিনি আরও যোগ করেন, “আমার বাড়িতে যদি কোনো দিন বোকার কোনো জার্সিটা ঢোকে, সেটা শুধু ওরই হবে।” একজন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকের কাছ থেকে এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে!
মূলত ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলেন ফ্লোরেস। তাঁর ডান পা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গতিও দুর্দান্ত। উইংয়ের দুই পাশ, নিখাদ স্ট্রাইকার কিংবা মূল স্ট্রাইকারের ঠিক পেছনে—সব জায়গাতেই তিনি খেলতে পারেন। তাঁর মতে, ৭, ৯, ১০ বা ১১ নম্বর পজিশনে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ড্রিবলিংকে তিনি নিজের প্রধান অস্ত্র মনে করেন। আদর্শ হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন মেসি এবং হুয়ান রোমান রিকেলমকে। তবে ওয়ান-টু-ওয়ানের লড়াইয়ে নিজেকে আরও দক্ষ করতে তিনি জেরেমি ডোকু ও জামাল মুসিয়ালার খেলা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। অর্থাৎ, ফ্লোরেস কেবল স্বপ্ন দেখেন না, বরং কঠোর পরিশ্রম ও হোমওয়ার্কও করেন।
বোকার হয়ে এখন পর্যন্ত ১৮ ম্যাচে গোল করেছেন ৪টি এবং সহায়তা দিয়েছেন ৩টিতে। বোকার দ্বিতীয় দল ও সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৬ ম্যাচে তাঁর গোল ১৩টি এবং সহায়তা ৭টি। জাতীয় দলের কোচ স্কালোনিও তাঁর প্রতি যথেষ্ট আশাবাদী। কোচ বলেন, “ফ্লোরেস খুব ভালো করছে। আমাদের ওর যত্ন নিতে হবে। ওর পাশে থাকতে হবে, সমর্থন দিতে হবে। ও আর ফ্রাঙ্কো (মাস্তানতুয়োনো) তরুণ খেলোয়াড়, যারা আমাদের আনন্দ দেবে।”
কোচের কথায় ‘ব্যবহার করা’র বদলে ‘যত্ন নেওয়া’র কথা বলাটা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আর্জেন্টিনা জানে, প্রতিভা যত দ্রুত বিকশিত হয়, ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও ততটাই বেশি থাকে।
ইতিমধ্যেই ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে এসেছেন ফ্লোরেস। ট্রান্সফারমার্কেটে তাঁর বর্তমান বাজারমূল্য ৮০ লাখ ইউরো, যা জাতীয় দলে নিয়মিত হওয়ার পর আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বোকা জুনিয়র্স তাঁর চুক্তি ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়েছে এবং সাথে যুক্ত করেছে দুই কোটি ডলারের রিলিজ ক্লজ। ফ্লোরেস প্রথম দলে আসার পর থেকে বোকা টানা ১৬ ম্যাচে অপরাজিত। মৌসুম শেষে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে বোকাকে, যদি না কোনো ইউরোপীয় ক্লাব রিলিজ ক্লজ দিয়ে তাঁকে কিনে নেওয়ার পরিকল্পনা করে।
এখন ফ্লোরেসের সামনে এক দীর্ঘ পথ। আপাতত তাঁর লক্ষ্য মাঠে নিজের সাফল্যের গল্প লেখা। সময়ই বলে দেবে তিনি কেবল ‘পরবর্তী মেসি’ হয়ে হারিয়ে যাবেন, নাকি হয়ে উঠবেন ‘প্রথম বেনজা’!