আগামী ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে জনসভার অনুমতি দিলেও ‘ইন্ডিয়া’ জোট ও বিরোধী দলগুলোর জন্য একের পর এক কঠিন শর্ত আরোপ করেছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশের এই কঠোর বিধিনিষেধের কারণে আয়োজকদের মধ্যে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় শর্ত হিসেবে জানানো হয়েছে, দিল্লির বাইরে থেকে যাঁরা বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর অথবা অন্য কোনো যানবাহনে চেপে জনসভায় আসবেন, তাঁদের গাড়ি অবশ্যই দিল্লির সীমান্তের বাইরে রাখতে হবে। কোনোভাবেই এই যানবাহনগুলোকে দিল্লির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
পুলিশের দাবি, এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হলো পরিবেশ দূষণ। দিল্লিতে যান চলাচলের জন্য বর্তমানে যে ধরনের ইঞ্জিনের অনুমতি (বিএস ৫) দেওয়া হয়েছে, পুলিশের ধারণা বাইরের রাজ্যের বাস বা ট্রাকের ইঞ্জিন সেই মানের হবে না। ফলে এই যানবাহনগুলো রাজধানীতে ঢুকলে দূষণের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাইই এই কড়াকড়ি করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের অনুমান অনুযায়ী, ওই জনসভায় অন্তত ১০ লাখ মানুষের ভিড় হতে পারে। যার একটি বড় অংশ আসবে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও রাজস্থান থেকে। লাখ লাখ মানুষকে বহনকারী বাস ও ট্রাক যদি রাজধানীতে অবস্থান করে, তবে শহরের যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এই পরিস্থিতি এড়াতেই পুলিশের এই পদক্ষেপ।
এছাড়া আরও বেশ কিছু শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ১ নভেম্বরের সভাটি অবশ্যই বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে। সভা শেষ হওয়ার পরপরই দ্রুত রামলীলা ময়দান খালি করে দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সভায় অংশগ্রহণকারী জনতাকে সেখানে রাত কাটাতে দেওয়া হবে না।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রামলীলা ময়দান থেকে রাজধানীর অন্য কোনো অংশে মিছিল করে যাওয়া যাবে না। অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি সভাস্থলে আসবেন এবং সভা শেষ করে সেখান থেকে ফিরে যাবেন।
নিরাপত্তার বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ। রামলীলা ময়দানে যেখানে মঞ্চ তৈরি করা হবে, তার চারপাশে আয়োজকদের অবশ্যই সিসি ক্যামেরা বসাতে হবে। এছাড়া ময়দানের প্রবেশ ও প্রস্থানের প্রতিটি পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা লাগানো বাধ্যতামূলক। প্রতিটি ক্যামেরা হতে হবে হাই–ডেফিনিশন, যাতে মানুষের চেহারা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। পাশাপাশি একটি আলাদা সিসি ক্যামেরা কন্ট্রোলরুম তৈরি করতে হবে এবং সভার পুরো অনুষ্ঠানসূচি ও প্রয়োজনীয় তথ্যের ভিডিও রেকর্ডিং করতে হবে।
বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক করা হয়েছে। সভায় অংশগ্রহণকারী কোনো ব্যক্তি উসকানিমূলক কথা বলতে পারবেন না। এমন কিছু বলা যাবে না যা হিংসা ছড়ায়, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে কিংবা জাতি–ধর্ম–বর্ণের ভিত্তিতে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। পুলিশ স্পষ্ট করেছে, এমন কোনো বক্তার মাইক সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে মঞ্চ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য একই ধরনের পোশাক পরা পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ময়দানের বিভিন্ন প্রান্তে পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা এবং পানীয় জলের সুব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। আয়োজকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা সময় সময় দিল্লি পুলিশকে সব আপডেট জানিয়ে রাখেন। পুলিশ হুঁশিয়ারি দিয়েছে, শর্ত পালন না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে কর্মসূচির অনুমতি প্রত্যাহার করা হতে পারে।
এদিকে, দিল্লির ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (সিটিআই) এই জনসভা ১০ দিন স্থগিত রাখার জন্য কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে অনুরোধ জানিয়েছিল। সিটিআই-এর চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েল রাহুলকে লেখা এক চিঠিতে জানান, ধনতেরাস, দীপাবলি ও ভাইফোঁটার বাজার এই সমাবেশের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে ব্যবসায়ীদের অন্তত ১০ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হতে পারে। রাহুল গান্ধী ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেই চিঠির জবাব দিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতি সহমর্মিতা জানান। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার হারালে সেই সঙ্গে আরও বহু কিছু হারান। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা প্রধানমন্ত্রীকে বলুন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে ইস্তফা দেওয়াতে বাধ্য করতে, আমি কথা দিচ্ছি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সব বিক্ষোভ বন্ধ হয়ে যাবে।”
পরবর্তীতে বুধবার ব্রিজেশ গোয়েল আরও একটি চিঠি লিখে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানান। তিনি লেখেন, “আমরা লড়াই চাই না, আলোচনা চাইছি। আপনি তো সবার সঙ্গে কথা বলেন। সবাইকে সময় দেন। আমরাও মাত্র ২০ মিনিট সময় চাইছি। আমাদের কথা শুনুন। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
ব্রিজেশ জানান, রামলীলা ময়দানের আশপাশের ২০টি বাজারের ২০ জন ব্যবসায়ী ২০ মিনিটের জন্য রাহুলের সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি অনুরোধ করেন, রাহুল যদি তাঁদের বোঝাতে পারেন যে জনসভার কারণে তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তবে তাঁরা এই সভাকে স্বাগত জানাবেন। অন্যথায়, ১০ নভেম্বর পর্যন্ত জনসভা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ব্রিজেশ গোয়েল বিজেপির একজন সক্রিয় সমর্থক। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে রাহুল তাঁর চিঠির জবাবে লেখেন, “আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। আপনাদের কথা শুনি। সরকার মেট্রো বন্ধ করে দিয়েছে। রাস্তা বন্ধ করেছে। দিল্লিতে লকডাউন শুরু করেছে। ভোট চুরি হলে আপনাদের দোকান, সঞ্চয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কোনো কিছুই সুরক্ষিত থাকবে না। আপনারা মোদিকে বলুন জ্ঞানেশকে ইস্তফা দিতে, ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিক্ষোভ বন্ধ হয়ে যাবে।”
রাহুলের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য ডেরেক ওব্রায়ানও জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা দিলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে রামলীরা ময়দান ছেড়ে দেওয়া হবে।