দিল্লির ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করেন, তবে মুহূর্তের মধ্যেই সব আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী বলেন, ‘মোদিজিকে বলুন জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করতে। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে তাহলে এই বিক্ষোভ, এই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাবে।’
মূলত ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট, ককরোচ জনতা পার্টি এবং যুব–ছাত্র আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মধ্য দিল্লির ব্যবসায়ীরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আগামী ১ নভেম্বরের জন্য নির্ধারিত রামলীলা ময়দান অভিযানের কর্মসূচি নিয়ে ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন ‘চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (সিটিআই) রাহুল গান্ধীকে একটি খোলাচিঠি লিখেছিল। উৎসবের মরসুমে এই সমাবেশ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়ে ওই চিঠিতে ব্যবসায়ীরা তাঁদের উদ্বেগের কথা জানান। আজ মঙ্গলবার ভোরে রাহুল গান্ধী সেই চিঠির জবাব দিয়েছেন।
উত্তর ভারতে উৎসবের মরসুম ১০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। ৬ নভেম্বর ধনতেরাস, ৮ নভেম্বর দীপাবলি এবং ১০ নভেম্বর ভাইফোঁটা—এই বিশেষ দিনগুলোর কথা উল্লেখ করে সিটিআইয়ের চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েল তাঁর চিঠিতে অনুরোধ করেছিলেন যেন ১০ তারিখ পর্যন্ত আন্দোলন বন্ধ রাখা হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, ১ নভেম্বরের রামলীলা ময়দান অভিযান স্থগিত না হলে ব্যবসায়ীদের প্রায় ১০ হাজার কোটি রুপির বাণিজ্য ক্ষতি হতে পারে। উল্লেখ্য, সেপ্টেম্বর মাসেই তাঁদের ৩ হাজার কোটি রুপির ক্ষতি হয়েছে। রামলীলা ময়দানের কর্মসূচি পিছিয়ে না দিলে ব্যবসায়ীরা পথে বসতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আজ মঙ্গলবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ‘পোস্ট’ করেন রাহুল গান্ধী। ১ নভেম্বরের রামলীলা অভিযানের পোস্টারের ছবির সাথে ইংরেজি ও হিন্দিতে দিল্লির ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য করে তিনি লেখেন, ‘আমি আপনাদের ভালোবাসি ও আপনাদের কথা শুনি’। সেই পোস্টে তিনি আরও বলেন, ‘সরকার মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে, রাস্তা সিল করে দিয়ে রাজধানীতে লকডাউন চালু করেছে। যখন সাধারণ মানুষের ভোট চুরি হয়, তখন কোনো কিছুই আর নিরাপদ থাকে না। আপনাদের দোকান, সঞ্চয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ—কোনো কিছুই নিরাপদ থাকে না। আপনারা মোদিকে বলুন, ৪ নম্বর অভিযুক্ত জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করতে, ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিক্ষোভ বন্ধ হয়ে যাবে।’
এর আগে কংগ্রেস সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভোট চুরির অভিযোগ তোলার সময় রাহুল গান্ধী একটি তালিকা প্রদর্শন করেন। সেখানে অভিযুক্তদের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের ছবি রাখা ছিল। তবে ব্যবসায়ীদের দেওয়া জবাবে তিনি ১, ২ ও ৩ নম্বর অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কেবল ৪ নম্বর অভিযুক্ত জ্ঞানেশ কুমারকে সরিয়ে দিলেই যাবতীয় বিক্ষোভ ও আন্দোলন শেষ হয়ে যাবে।
রাহুলের এই বার্তার ঠিক আগে, গতকাল সোমবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাগড়ে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, প্রচুর পরিমাণে ভোট চুরির তথ্য ফাঁস হওয়া সত্ত্বেও সরকার সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করে জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
খাড়গের এই অভিযোগের মূলে রয়েছে তথ্য জানার অধিকার আইনের (আরটিআই) আবেদন প্রত্যাখ্যান। এসআইআরের সময় ভোটারদের তথ্য যাচাই এবং অসংগতি দূর করতে কোন নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বা ‘সফটওয়্যার’ ব্যবহৃত হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেই তথ্য দিতে অস্বীকার করেছে। কমিশনের দাবি, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, বাণিজ্যিক আস্থা রক্ষা এবং বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকারের কারণে এই তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তেলেঙ্গানার সমাজকর্মী এম এ মুজিব আইয়ুব আরটিআই-এর মাধ্যমে জানতে চেয়েছিলেন যে, ভোটার তালিকার ভুল ও অসংগতি চিহ্নিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং বা স্বয়ংক্রিয় প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিকসের ব্যবহার করা হয়েছে কি না। যদি হয়ে থাকে, তবে কোন প্রযুক্তি বা অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহৃত হয়েছে তা জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। মল্লিকার্জুন খাগড়ে তাঁর পোস্টে সবাইকে রামলীলা ময়দানে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, শুধু ভোট নয়, এই লড়াই গণতন্ত্র বাঁচানোর সংগ্রাম। তিনি আরও জানান, উত্তর প্রদেশে ১৬ লাখ ১৮ হাজার ফর্ম ৬-এর আবেদনের বিবরণ জনসমক্ষে আনা হয়নি। ওই রাজ্যের পিলিভিট বিধানসভা কেন্দ্রের ১০ হাজার ৪৭০ জন ভোটারের রেকর্ডে অনিয়ম পাওয়া গেছে। এর ফলে কমিশন রাজ্যজুড়ে ফর্ম ৬, ৭ ও ৮ নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়েছে।
উল্লেখ্য, নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত হয় ফরম ৬, ভোটারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য ব্যবহৃত হয় ফরম ৭ এবং ভোটারের নিবন্ধন পরিমার্জনের আবেদনের জন্য ব্যবহৃত হয় ফরম ৮।
গত ২১ অক্টোবর পিলিভিট বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়ার পর প্রদেশ কংগ্রেসের অভিযোগের ভিত্তিতেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তা ওই তিন ধরনের ফরম খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। কংগ্রেসের অভিযোগ, হাজার হাজার ভোটারের ক্ষেত্রে ফটো, পরিচয়পত্র নম্বর ও ক্রমিক নম্বর অপরিবর্তিত থাকলেও নাম বদলে দেওয়া হয়েছে।