উৎসবের মরসুমে দিল্লির রামলীলা ময়দানে পরিকল্পিত বিক্ষোভ কর্মসূচির তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। দিল্লির ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিটিআই) এই আবেদন জানিয়েছে। সংগঠনের দাবি, অক্টোবর মাসজুড়ে বিভিন্ন বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রভাবে ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে ৩ হাজার কোটি রুপির আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। নভেম্বরেও যদি এই ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকে, তবে লোকসানের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

গত শুক্রবার দিল্লির চেম্বার অব ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান ব্রিজেশ গোয়েল রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেছেন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের উৎসবের মরসুমে দিল্লির ব্যবসায়ীরা প্রায় ২৫ হাজার কোটি রুপির বাণিজ্য করেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে কনট প্লেস থেকে শুরু করে মধ্য দিল্লির ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। এই নাজুক পরিস্থিতিতে ১ নভেম্বর রামলীলা গ্রাউন্ডে বিরোধীরা যদি জনসভা ও বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন, তবে ক্ষতির বহর আরও বাড়বে এবং তা হবে অপূরণীয়। তাই জনস্বার্থে ওই সমাবেশের তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

চিঠিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে যে, রামলীলা ময়দানের ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে চাঁদনি চক, সদর বাজার, কাশ্মীরি গেট, জামা মসজিদ, ঝান্ডেওয়ালা ও করোল বাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলো অবস্থিত। এই অঞ্চলগুলোতে হাজার হাজার পাইকারি ও খুচরা বাজার রয়েছে। এছাড়া কনট প্লেসের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রও এই এলাকার অন্তর্ভুক্ত। বিক্ষোভ প্রদর্শনের স্থানটির খুব কাছেই নিউ দিল্লি ও পুরানা দিল্লি রেলস্টেশন অবস্থিত, যেখান দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যবসায়ী যাতায়াত করেন। বিক্ষোভের কারণে এই দুই স্টেশনে যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রামলীলা ময়দানের সমাবেশও একই পরিস্থিতি তৈরি করবে, যার ফলে দিল্লি আসা ও দিল্লি ছেড়ে যাওয়া যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাবে।

ব্রিজেশ গোয়েল চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, অক্টোবর মাসে একের পর এক আন্দোলনের কারণে বাজার বন্ধ ছিল, যার ফলে কেনাকাটা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গাপূজার পর এখন অন্যান্য উৎসবের দিন ঘনিয়ে আসছে। ৬ নভেম্বর ধনতেরাস, ৮ নভেম্বর দীপাবলি এবং ১০ নভেম্বর ভাইফোঁটা। এই সময়ে সমগ্র উত্তর ভারতে কেনাকাটার ব্যাপক ধুম পড়ে। মানুষ সোনা, রুপা, বাসনপত্র, পোশাকের পাশাপাশি গাড়ি ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য কেনেন এবং একে অপরকে উপহার দেওয়ার রীতি পালন করেন। মিষ্টি-মিঠাই থেকে শুরু করে হরেক রকমের উপহারসামগ্রীর বিক্রি এই সময়ে তুঙ্গে থাকে। নভেম্বরে লাগাতার বিক্ষোভ চললে ব্যবসায়ীদের চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হবে।

চিঠিতে পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইতিমধ্যে ৩ হাজার কোটি রুপি লোকসান হয়েছে এবং রামলীলা গ্রাউন্ডের কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন না হলে এই ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছাবে। উল্লেখ্য, এই সময়ে দিল্লিতে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ মোটামুটি ২৫ হাজার কোটি রুপি।

নিউ দিল্লি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অতুল ভার্গবও গত সপ্তাহে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতির বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অধিকার আছে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শামিল হওয়ার। তেমনই আমাদেরও বাণিজ্য করার ও জীবন নির্বাহের অধিকার আছে। যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ সত্ত্বেও আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য খোলা ছিল; কিন্তু গত শুক্রবার কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে বিক্ষোভ কর্মসূচির কারণে বাজারের অধিকাংশ দোকান বন্ধ রাখা হয়েছিল। যাঁরা খুলে রেখেছিলেন, তাঁদেরও কোনো লাভ হয়নি। কারণ, আন্দোলনের ভয়ে লোকজন বাজারমুখী হননি।”

ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-কে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সিজেপি এবং ইন্ডিয়া জোটের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন তাদের নিজস্ব কর্মসূচি ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা এবং বিশেষ করে কনট প্লেস এলাকার লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্ট্রিট হকারদের স্বার্থ রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা করা হয়েছিল। সেখানে বিক্ষোভ বন্ধের আবেদন জানানো হলেও সুপ্রিম কোর্ট সেই আরজি খারিজ করে দেন। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বিক্ষোভের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করতে রাজি হননি। তবে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া না হয়। বিচারপতিরা আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, বিক্ষোভকারীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে।

বিচারপতিরা আরও উল্লেখ করেছিলেন, বিক্ষোভের ফলে ব্যবসায়ী ও দৈনন্দিন মজুরিভিত্তিক শ্রমিকদের রুজিরোজগার বন্ধ হলে তাঁরা ক্ষতিপূরণের জন্য সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য হবেন।

সিটিআই-এর এই অনুরোধের বিষয়ে ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে ১ নভেম্বরের রামলীলা ময়দানের বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে।