ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে। এর পরিবর্তে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য তিনটি নির্দিষ্ট স্থানের কথা জানিয়েছে সরকার। তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, এখন থেকে এসব নির্ধারিত স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে হলে আয়োজকদের পকেট থেকে অর্থ খরচ করতে হবে। পুরো ব্যবস্থাটি যেন ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
সরকারের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সব বিরোধী দল এবং নাগরিক সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলাও দায়ের করা হয়েছে, যদিও এর চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে তা অনিশ্চিত। তবে স্পষ্ট যে, নরেন্দ্র মোদির সরকার চায় না তাদের চোখের সামনে প্রতিবাদকারী মানুষ ভিড় করুক, স্লোগান দিক কিংবা আন্দোলনের ঢেউ জনজীবনে কোনো প্রভাব ফেলুক। আর সেই উদ্দেশ্যেই এই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধুমাত্র অর্থ প্রদানের বিষয়টিই নয়, নতুন নির্ধারিত তিন জায়গায় বিক্ষোভকারীরা চাইলেই অবস্থান বা ধরনায় বসতে পারবেন না। আগে নিশ্চিত হতে হবে যে সংশ্লিষ্ট জায়গাটি খালি আছে কি না, এবং সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিক্ষোভ কর্মসূচি সাজাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, রামলীলা ময়দানে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বিক্ষোভ আয়োজন করতে চাইলে এই বছরের মাত্র তিনটি দিন তাদের জন্য বরাদ্দ হতে পারে— যা হলো ডিসেম্বরের ২৯, ৩০ ও ৩১ তারিখ। কারণ বছরের বাকি দিনগুলোতে সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচি নির্ধারিত থাকে।
সুপ্রিম কোর্ট যদি এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে এবং লুটেন্স দিল্লির হৃৎপিণ্ডের কাছাকাছি অবস্থিত যন্তর মন্তর বিক্ষোভ সমাবেশের জন্য স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে ধরে নিতে হবে যে রাজধানী দিল্লিতে শাসকের নজর এড়িয়ে কেউ আর ‘বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে অশান্তি’ সৃষ্টি করতে পারবে না।
গাছপালা ঘেরা যন্তর মন্তর থেকে রামলীলা ময়দানের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। ২০১১ সালে যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করলেও দ্বিতীয় দফার আন্দোলনের জন্য প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারে ১২ একর জায়গার রামলীলা প্রাঙ্গণটি বেছে নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের প্রভাবই শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস সরকারের পতনের পথ প্রশস্ত করেছিল এবং জন্ম হয়েছিল আম আদমি পার্টির (আপ)। এখন সেই একই জায়গায় আন্দোলন করতে হলে ময়দান ভাড়া নিতে হবে, যার একদিনের খরচ ১ লাখ ২১ হাজার ৮০ রুপি। এর পাশাপাশি ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’ হিসেবে আরও ৫৫ হাজার রুপি জমা দিতে হবে।
একই নিয়ম কার্যকর করা হয়েছে পূর্ব দিল্লির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্টের ক্ষেত্রেও। রামলীলা ময়দানের মতো এই মাঠটিও ১২ একরের, তবে এর দূরত্ব তিন গুণ বেশি অর্থাৎ ১২ কিলোমিটার। এই মাঠের মালিকানা দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ)-র হাতে। সেখানে বিক্ষোভ, ধরনা বা অবস্থানের জন্য কেউ যদি এক দিনের জন্য তিন হাজার বর্গমিটার জায়গা ভাড়া নিতে চায়, তবে তাকে ১ লাখ ৮৭ হাজার রুপি পরিশোধ করতে হবে এবং সিকিউরিটি ডিপোজিট দিতে হবে ৯৫ হাজার রুপি।
অন্যদিকে, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান যন্তর মন্তর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ৫৭ একর জমির এই ময়দানটির মালিকও ডিডিএ। যদিও ডিডিএ-র ওয়েবসাইটে ভাড়ার কথা উল্লেখ নেই, তবে জানা গেছে যে এই ময়দান আংশিকভাবেও ভাড়া নেওয়া সম্ভব।
তবে অর্থ প্রদান করলেই যে বিক্ষোভ করা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সবকিছুই নির্ভর করবে দিল্লি পুলিশের মর্জির ওপর। বিয়েশাদি, সম্মেলন, মেলা, রামলীলা, নবরাত্রি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক জনসভা কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ভিড়ে বিক্ষোভ দেখানোর দিন পাওয়া গেলেও, দিল্লি পুলিশের চূড়ান্ত অনুমতি না মিললে কিছুই করা যাবে না। অর্থাৎ, সরকার চাইলে সিজেপি বা ইন্ডিয়া জোটের মতো দলগুলোর পক্ষে নির্দিষ্ট স্থানে বিক্ষোভ দেখানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
নির্বাচনী জনসভা ছাড়া সাধারণত কোনো রাজনৈতিক দলই এই তিন ময়দান বিক্ষোভ বা আন্দোলনের জন্য ভাড়া নেয় না। তাদের ধারণা, এভাবে ভাড়া করে আন্দোলন করলে দাবিদাওয়া সরকারের কানে পৌঁছাবে না। ভারতে রাজনৈতিক দাবি জানাতে বা বিক্ষোভের জন্য টাকা দিয়ে জায়গা ভাড়া করার সংস্কৃতি আগে কখনো চালু হয়নি, যদিও মোদি সরকার এখন তেমনটাই চাইছে।
নব্বইয়ের দশকে নরসিংহ রাও সরকার বোট ক্লাব জনবিক্ষোভ বা জনসমাবেশের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। তারপর থেকেই যন্তর মন্তর হয়ে উঠেছিল ক্ষোভ ও বিক্ষোভ প্রকাশের প্রধান কেন্দ্র। এখান থেকেই নির্ভয়ার মা সুবিচার পেয়েছিলেন। এখানেই সিএএ-বিরোধী আন্দোলনকারীরা রাজপথে নেমেছিলেন। মহিলা কুস্তিগিরেরা বিজেপি দলীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার প্রতিবাদে এখানে অবস্থান করেছিলেন। আগামী দিনে যন্তর মন্তরের ভাগ্যে কী লেখা আছে, তা হয়তো একমাত্র সুপ্রিম কোর্টই নির্ধারণ করবেন।