পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা গেছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সাধারণত আন্দোলনকারীদের সংখ্যার তুলনায় পুলিশি বহর এত বেশি হয় না, তবে এবার দিল্লিতে ঠিক তেমনটাই দেখা গেল।
শুক্রবার শেষ রাত থেকেই প্রায় ৩৫ হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য প্রস্তুতি নেন, যাতে মাত্র হাজার বিশেক আন্দোলনকারীকে কঠোরভাবে দমন করা যায়। বহিঃশত্রুর মোকাবিলা করার ক্ষেত্রেও দিল্লিবাসী কখনো এমন তৎপরতা দেখেনি। এই পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে, তেলাপোকারা নরেন্দ্র মোদি সরকার ও শাসক দল বিজেপিকে কতটা আতঙ্কিত করে রেখেছে।
এদিকে অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা এবং সৌরভ দাসের মতো ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদের পাশাপাশি জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও খোলাখুলিভাবে দাবি করছেন যে, মোদি সরকার এখন ভীত। তাঁদের মতে, এটি মূলত পতনের ভয়, কর্তৃত্ব ও মান হারানোর ভয় এবং ক্ষমতা হারানোর ভয়। অন্যথায়, নিজেদের দেশের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের জন্য সরকার এভাবে জীবন মরণপণ লড়াই করত না।
জুন ও জুলাই মাসের বিক্ষোভ যে এতটা মারাত্মক রূপ নিতে পারে কিংবা জেন-জির প্লাবনে রাজধানী ভেসে যেতে পারে, তা দিল্লি পুলিশের অভিজ্ঞ কর্তারা আগে অনুমান করতে পারেননি। তাঁরা সরকারের কাছে স্বীকার করেছিলেন যে, পার্লামেন্ট অভিযানের সময় তাঁদের ধারণা ছিল বড়জোর দশ হাজার পড়ুয়া ভিড় করবে। কিন্তু বাস্তবে লক্ষাধিক মানুষের ঢল নেমেছিল। সেই পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশকে লাঠি, টিয়ার গ্যাস, জলকামানের পাশাপাশি পেলেট গান পর্যন্ত ব্যবহার করতে হয়েছিল। এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে পুলিশ ও সরকার শিক্ষা নিয়েছে।
এবার সরকারের অনুমান ছিল যে, কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের ফাঁক দিয়ে প্রায় ২০ হাজার জেন-জি ভিড় করতে পারে। তাঁদের রুখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ৪৩ হাজার বাহিনীর বন্দোবস্ত করেন, যার মধ্যে শনিবার ৩৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল যে, যন্তর মন্তর কেন্দ্রিক পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কাউকে ভিড় করতে দেওয়া যাবে না এবং অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তা ঠেকিয়ে দিতে হবে। তবে বলপ্রয়োগ হবে সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে।
অভিজিৎ, আশুতোষ ও সৌরভদের আশঙ্কা ছিল, সরকার তাঁদের কাউকেই যন্তর মন্তরের কাছাকাছি পৌঁছাতে দেবে না এবং প্রয়োজন হলে আগেই গ্রেপ্তার করা হবে। বেঙ্গালুরুতে গণমাধ্যমের সামনে তাঁরা এই আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, “আমাদের আটক করা হলেও অন্যরা যেন অভিযান চালিয়ে যান।” তাঁদের এই আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হয়। শনিবার ভোরে গুড়গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে। জার্মানি থেকে ভারতে এসে তিনি তেলাপোকাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। শুক্রবার রাতে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, “জানি না কাল কী হবে, তবে এটা বুঝতে পারছি, মানুষ জেগে উঠেছে।”
মানুষ যে জেগে উঠেছে, তার প্রমাণ হিসেবে এসআইআর বাতিল এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া জনবিক্ষোভকে দেখা যাচ্ছে। একদিকে ‘ইন্ডিয়া’ জোট এবং অন্যদিকে সিজেপি—এই দুই শক্তির সমন্বয়ে মোদি সরকার প্রতিদিন নতুন করে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ সফল হতে না দেওয়ার যে সংকল্প সরকার নিয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটেছে রাজধানী দিল্লিতে। ধ্রুব রাঠিকে গ্রেপ্তারের পর সরকারের লক্ষ্য ছিল সিজেপির ত্রিমূর্তির ওপর। শনিবার সকালে তাঁদের উড়োজাহাজ দিল্লি পৌঁছানো মাত্রই পুলিশ অভিজিৎ, আশুতোষ ও সৌরভকে আটক করে; তাঁদের উড়োজাহাজ থেকে নামার সুযোগটুকুও দেওয়া হয়নি।
যন্তর মন্তরসহ পুরো এলাকা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়ার পাশাপাশি শনিবার সকাল থেকে পাঁচ কিলোমিটার এলাকার ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। শুক্রবারই দিল্লি পুলিশ ও সরকার এই পদক্ষেপের ঘোষণা করেছিল এবং মহল্লায় মহল্লায় তা প্রচার করা হয়। এর ফলে গ্রাউন্ড জিরো থেকে বিভিন্ন নিউজ চ্যানেল ও ইউটিউবারদের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশি পাহাড়ার কারণে কতজন মানুষ যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে পেরেছেন, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দিল্লিতে আগে এমন ঘটনা ঘটেনি।
শুক্রবার জানানো হয়েছিল যে, দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ থাকবে। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিরক্তি প্রকাশের পর দিল্লি প্রশাসন জানায়, ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা হচ্ছে। রেল মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়েছিল যে, শনিবার দুপুর দুইটা পর্যন্ত দিল্লির কোনো রেলস্টেশনে ট্রেন প্রবেশ করবে না বা ছাড়বে না। এর ফলে রাজধানী এক্সপ্রেস ও দুরন্তসহ মোট ২৫০টি ট্রেন বাতিল করা হয়। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগাম গ্রেপ্তার, হোটেলের তল্লাশি এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশের হুমকি সত্ত্বেও অকুতোভয় যাঁরা আন্দোলনে যোগ দিতে দিল্লিতে জড়ো হয়েছিলেন, তাঁদের কাউকেই যন্তর মন্তরের কাছাকাছি পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।
শনিবার দুপুর ১২টায় পুলিশ জানায়, যন্তর মন্তর এলাকা শান্ত রয়েছে এবং অন্যত্র প্রায় ৫০০ জন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের এই কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কাউকে ভেতরে ঢুকতে না দেওয়ার কৃতিত্ব সরকার নিতে পারে।
সরকারের পাশাপাশি বিজেপিও এই বিষয়ে তৎপর। তারা এই আন্দোলনকে দেশপ্রেমিক বনাম দেশবিরোধীর লড়াই হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন শনিবার বলেছেন, “দেশকে দুর্বল করার এই চক্রান্ত সব রকমভাবে তাঁরা ব্যর্থ করবেন।”
এই উদ্দেশ্যে যন্তর মন্তর এলাকায় বিজেপি সমর্থকদেরও ছড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তবে কাউকে কাছাকাছি ভিড় করতে না দেওয়ায় তাঁদের ব্যবহার বা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।