ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং তাদের সমর্থকদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের আন্দোলন রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ট্রেন, মেট্রোসহ শহরের বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থায় কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারগুলোকে সতর্ক করা হচ্ছে। আজ শনিবার রাজপথে যাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ‘জ্ঞানেশ হটাও’ অভিযানে কেউ অংশ নিতে না পারেন, সেজন্য পুলিশ ও প্রশাসন ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই কঠোর অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, “মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।” আদালত মনে করে, আন্দোলন রুখতে দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা মানা যায় না এবং টানা ১০ ঘণ্টা রেলস্টেশনে ট্রেন আসা-যাওয়া বন্ধ রাখা অনুচিত। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ট্রেন চলাচল কিংবা শহরের অভ্যন্তরে যান চলাচল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে অসুবিধায় পড়তে না হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকেসহ অন্যান্য নেতারা ঘোষণা করেছেন যে, ১০ অক্টোবরের ‘যন্তর মন্তর ২.০’-তে অংশ নেবেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। আন্দোলনে শরিক হতে ভারতে এসে ধ্রুব নিজেও বলেছেন, “এটা গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। ১০ তারিখে কেউ দিল্লি আসতে ভুলবেন না।”

অন্যদিকে, ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুতে ধ্রুবর পাশে থাকা দক্ষিণের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ জানান, “আলি রে আলি, জ্ঞানু, সময় শেষ; এবার তোমার যাওয়ার পালা।” তবে সংশয় কাটছে না যে, অভিজিৎ দিপকেসহ সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে ধ্রুব রাঠিদের দিল্লি পুলিশ আজ শনিবার রাজপথে নামতে দেবে কি না, নাকি তাঁদের আগেই গ্রেপ্তার করা হবে।

এই সন্দেহ অমূলক নয়, কারণ দিল্লি আসা ঠেকাতে বিভিন্ন রাজ্যে হাজার হাজার জেন-জি তরুণকে আটক করা হয়েছে। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে পুলিশ ইতিমধ্যে ১০ হাজার সিজেপি কর্মী ও সমর্থককে আটক করেছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা। গত বৃহস্পতিবার এক্সে তিনি লিখেছেন, আটক করা হয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক দল ও সিজেপি সমর্থকদের। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, নানা জায়গা থেকে শিক্ষার্থীদের আটক করে ভ্যানে করে কোথায় নেওয়া হচ্ছে এবং কেন তাঁদের আটক করা হচ্ছে, সে বিষয়ে পুলিশ কিছুই জানাচ্ছে না।

ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে গতকাল গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমরা যন্তর মন্তর অভিযান করবই, যা হয় হোক।” সেই বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনি আমাদের জেলে ঢোকান বা গুলি করুন, আমরা প্রস্তুত। আপনার মানসিক বিকারগ্রস্ত আচরণে আমরা পিছু হটব না।” দিপকে আরও জানিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম মুখপাত্র দীপক বালিয়ান ও তাঁর ভাইকে রাজস্থান পুলিশ প্রচণ্ড মারধর করে আটকে রেখেছে।

আজকের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযান ঠেকাতে পুলিশ সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। দিল্লি পুলিশের ২০ হাজার কর্মী ছাড়াও আধা সামরিক বাহিনীর ২৩ হাজার সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া পাঁচ কোম্পানি সশস্ত্র নারী পুলিশ এবং জম্মু-কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড় থেকে সিআরপিএফ জওয়ানদের উড়িয়ে আনা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলো থেকে কয়েক শ বাস আনা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের আটকে রাখার জন্য দিল্লির বাওয়ানার রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামসহ ১০টি স্টেডিয়াম চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনে একাধিক দিন তাঁদের রাখা হবে। যন্তর মন্তর এলাকায় গতকাল রাত ১০টা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছে। এর আগে ‘ইন্ডিয়া’ জোট ও সিজেপির আন্দোলনের সময়েও এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

জেন-জি তরুণদের দিল্লি প্রবেশ ঠেকাতে শনিবার ভোর ৪টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত মোট ১০ ঘণ্টা সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লি, পুরোনো দিল্লি ও নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে ওই সময় কোনো ট্রেন ছাড়বে না এবং আসবেও না। প্রতিটি রেলস্টেশনে বিশেষ পুলিশি নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ট্রেনের আসা-যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। একই তৎপরতা রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানার সীমান্ত এলাকাগুলোতেও দেখা যাচ্ছে।

উত্তর প্রদেশের কৃষকনেতারা সিজেপির আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, তাঁরাও এতে যোগ দেবেন, তবে তাঁদের ঠেকাতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। গতকাল রাত নয়টার পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ৫৭টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অ্যাপ-চালিত ভাড়ার গাড়ির গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে যাতে কেউ লুটেন্স দিল্লিতে আসতে না পারে। এছাড়া শুক্র ও শনিবার দিল্লির সব মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সতর্কতার পাশাপাশি দিল্লি পুলিশ প্রতিটি হোটেল, ছাত্রাবাস এবং পেয়িং গেস্ট বাড়িগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে। বাইরের কম বয়সী ছেলেমেয়েদের থাকতে না দেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। পাহাড়গঞ্জ এলাকার হোটেল মালিকদের বলা হয়েছে যেন এই দুই দিন কোনো নতুন বুকিং না নেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের এক বড় কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে কেউ যেন হঠকারী না হন। এমনকি মসজিদে গিয়ে ইমামদের দিয়ে বলানো হচ্ছে যেন সবাই ঘরে থাকেন এবং কেউ আন্দোলনে না যান, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

সরকার মনে করছে, বড় সংবাদপত্র ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এখন আর শাসকের অনুকূলে জনমত তৈরি করতে পারছে না। মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউবার ও রিল মেকারদের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। সিজেপির প্রথম যন্তর মন্তর অবস্থানের সময় এই প্রভাব প্রবল ছিল, তাই এবার পুলিশ বিশেষভাবে সক্রিয়। সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক সাংবাদিকদের বলা হয়েছে, প্রত্যেক ‘সিটিজেন জার্নালিস্ট’-কে পরিচয়পত্র বুকে ঝুলিয়ে রাখতে হবে এবং লাইভ স্ট্রিমিংয়ের নামে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া যাবে না।

ভারতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এই লড়াই করছেন উল্লেখ করে গতকাল রাতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার তথ্য যাচাই (এসআইআর) বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সেটা সম্ভব হবে না।” তিনি জানান, সকালে তিনি যন্তর মন্তরে যাবেন এবং সেখানে তাঁকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হলেও আন্দোলন বন্ধ হবে না।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের এই দাবির সূত্রপাত হয় গত মাসের শেষ দিকে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে উদ্বেগ জানালেও তিনি তা গুরুত্ব দেননি। এরপর কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ এনে এই আন্দোলন শুরু করে এবং পরবর্তীতে সিজেপি এতে যোগ দেয়। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিজেপির আন্দোলনের মুখে গত জুলাইয়ে মোদির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এবারও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলন দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটও এই দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল গতকাল রাতে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভোট চুরি করে বিজেপিকে ক্ষমতায় রাখছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে সিপিআই (এম–এল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন ‘আইসা’র নেত্রী নেহা বোরা গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে থাকা একজন কাপুরুষোচিত স্বৈরশাসকের অবস্থান এখন সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেছে।” নেহা বোরা আরও বলেন, সরকার দেশে খোলাখুলিভাবে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। তিনি তুলনা করে বলেন, ঠিক এভাবেই ব্রিটিশ সরকার ভারত ছাড়ো আন্দোলন রুখতে চেষ্টা করেছিল এবং নেতাদের আটক করেছিল, কিন্তু তা আন্দোলন বন্ধ করতে পারেনি। তাঁর মতে, ইতিহাস এভাবেই ফিরে ফিরে আসে।