ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে আর কাউকে বিক্ষোভ সমাবেশ বা ধরনায় বসতে দেওয়া হবে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ।

গতকাল রোববার এই নির্দেশিকা জারি করে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, এখন থেকে বিক্ষোভ দেখাতে হলে আন্দোলনকারীদের তিনটি নির্দিষ্ট জায়গার কোনো একটি বেছে নিতে হবে। নির্ধারিত সেই তিন জায়গা হলো পুরোনো দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারির মাঠ অথবা পূর্ব দিল্লির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট বা ‘সিবিডি’ ময়দান।

এর অর্থ হলো, সেন্ট্রাল বা মধ্য দিল্লির কোনো এলাকায় আর কাউকে বিক্ষোভ করার অনুমতি দেওয়া হবে না। উল্লেখ্য, দেশের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্বাচনের পরামর্শ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই সুপারিশের ওপর ভিত্তি করেই কেন্দ্রীয় সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে সরকারিভাবে দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দেয়। তবে বিরোধীরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি নন।

দিল্লির পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমার ওই নির্দেশে জানান, যন্তর মন্তর আর প্রতিবাদস্থল থাকছে না। বিক্ষোভ দেখাতে হলে কোনো রকম সমাবেশ করতে হলে আন্দোলনকারীদের তিনটির মধ্যে একটি স্থান বেছে নিতে হবে।

নির্ধারিত স্থানগুলোর মধ্যে পুরোনো দিল্লির রামলীলা ময়দান যন্তর মন্তর থেকে অন্তত চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দ্বিতীয় স্থানটি হলো পূর্ব দিল্লির সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট (সিবিডি) ময়দান, যা সেন্ট্রাল দিল্লিতে অবস্থিত যন্তর মন্তর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে। আর তৃতীয় এলাকাটি হলো উত্তর দিল্লির বুরারি মাঠ, যার দূরত্ব যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার।

দিল্লির পুলিশ কমিশনার আরও জানিয়েছেন, ওই তিন জায়গার কোথাও বিক্ষোভ দেখাতে গেলে পুলিশের কাছ থেকে কীভাবে অনুমতি নিতে হবে, কত দিন আগে পুলিশকে জানাতে হবে এবং কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশিকা পরবর্তীতে জারি করা হবে।

দিল্লি পুলিশের ওই নির্দেশিকায় ১১ অক্টোবর তারিখ থাকলেও আজ সোমবার দুপুরের আগে তা প্রকাশ্যে আসেনি। আজ বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা আশুতোষ রাঙ্কা, সৌরভ দাস ও রত্না সিং পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ আয়োজনের অনুমতি চাইতে। পুলিশকে সিজেপির নেতারা বলেন, কোথায় সেই অনুমতি দেওয়া হবে তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানিয়ে দিতে। এর পরেই দিল্লি পুলিশের ওই নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসে।

এরপরেই সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে ‘এক্স’ মারফত জানান, “ভিতু একনায়কের কারণে যন্তর মন্তর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। এবার পুরো দেশ যন্তর মন্তর হয়ে উঠবে।”

সিজেপি নেতাদের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও পুলিশের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেন, “সরকার বিক্ষোভকারীদের ভয় পাচ্ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে তারা জনতার বিক্ষোভ দূরে রাখতে চায়। তাই এই অগণতান্ত্রিক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত।”

সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস ওই সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য জানিয়ে বলেন, “নরেন্দ্র মোদি যন্তর মন্তর বা বিক্ষোভকে কেন এত ভয় পাচ্ছেন জানি না। যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল এই সরকারের আমলেই। তারাই এখন সেই স্থান বাতিল করছে।”

সৌরভ আরও বলেন, যেভাবে যন্তর মন্তরকে ছাঁটাই করা হলো, সেভাবেই মোদি সরকার একদিন গণতন্ত্রকেও বাতিল করে দেবে। এটা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এক বড় পদক্ষেপ। সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সৌরভ বলেন, এটা জনগণের মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। এই সিদ্ধান্ত তাঁরা মানবেন না। এই নির্দেশ জারির আগে সরকার কারও সঙ্গে আলোচনা করেনি। কেউ ওই সিদ্ধান্ত মানবেও না।

স্বাধীনতার পর থেকে সেন্ট্রাল বা মধ্য দিল্লির বোট ক্লাব নির্দিষ্ট ছিল রাজনৈতিক বিক্ষোভস্থল হিসেবে। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে সোজা যে সড়ক ইন্ডিয়া গেট হয়ে ন্যাশনাল স্টেডিয়াম পর্যন্ত চলে গেছে, পৌনে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সেই প্রশস্ত সড়কের নাম ব্রিটিশ আমলে ছিল ‘কিংসওয়ে’। স্বাধীনতার পর সেই নাম বদলে রাখা হয় ‘রাজপথ’।

নরেন্দ্র মোদি সেই রাজপথের নাম বদলে রেখেছেন ‘কর্তব্যপথ’। এই সড়কের দুই ধারে সবুজ লন ও অগভীর জলাধার রয়েছে। এই জলাধারে বোটিং হতো বলে এলাকাকে বোট ক্লাব বলে ডাকা হয়। বড় বড় জনসমাবেশ হতো এখানেই।

১৯৮৮ সালে পশ্চিম উত্তর প্রদেশের কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের সংগঠন ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের ডাকে বিভিন্ন দাবিতে পাঁচ লাখ কৃষক রাজপথের দখল নিয়েছিলেন। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কৃষকেরা ওই তল্লাটে অবস্থান করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা চলে যান প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তাঁদের ৩৫ দফা দাবি মেনে নেওয়ায়।

নরসিংহ রাও প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের জায়গা হিসেবে গোটা রাজপথ মুক্ত করে দেন। সিদ্ধান্ত হয়, কোনো বিক্ষোভই আর রাজপথে বা বোট ক্লাবে দেখানো যাবে না। সেই থেকে যন্তর মন্তরই হয়ে ওঠে বিক্ষোভ দেখানোর অঘোষিত স্থান।

এ বছরের ২৮ এপ্রিল দিল্লি পুলিশ এক নির্দেশিকায় যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এতকাল যা ছিল অঘোষিত, তা স্বীকৃতি পায় ওই সরকারি নির্দেশিকায়। সিজেপি নেতারা জুন মাসে ওখানেই বিক্ষোভ দেখানোর অনুমতি চেয়েছিলেন। পুলিশ সেই অনুমতি তাদের দিয়েছিল। ২০ জুলাই জনবিক্ষোভ সামাল দিতে সরকার ব্যর্থ হয়। তারপর সরকার ঠিক করে সংসদ ভবন ও কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের এত কাছে বিক্ষোভকারীদের আর আসতে দেওয়া হবে না।

পৃথিবীর সর্বত্রই সরকারি অধিষ্ঠানের কাছে বিক্ষোভের অধিকার ও অনুমতি দেওয়া হয়। দিল্লিতেও সেটিই ছিল নিয়ম। রাজধানীর কেন্দ্রস্থল সংসদ ভবন থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে রামলীলা ময়দান, ১২ কিলোমিটার দূরে সিবিডি ময়দান কিংবা ২২ কিলোমিটার দূরে বুরারি ময়দানে বিক্ষোভকারীরা যেতে চাইবেন কি? রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চিতই তা মেনে নেবে না। অর্থাৎ বিরোধীদের সঙ্গে আরেকবার সংঘাতের মুখোমুখি হতে চলেছে সরকার।