ভারতের রাজধানী দিল্লির বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেকে আটক করেছে পুলিশ। যন্তর মন্তরে সিজেপির পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ যখন উড়োজাহাজে প্রবেশ করে, তখন দিপকে ইনস্টাগ্রামে সরাসরি সম্প্রচারে যান। তাঁর পোস্ট করা সেই ভিডিওতে দেখা যায়, উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই পুলিশ অভিজিৎ দিপকে এবং সিজেপির অন্য দুই সদস্য সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করছে। ভিডিওতে উড়োজাহাজের ভেতরে চরম উত্তেজনা ও হইচই হতে দেখা যায়। সিজেপির সদস্যরা পুলিশের সঙ্গে তীব্র তর্ক করছিলেন। যাত্রীদের নামার জন্য অপেক্ষা না করে পুলিশ কেন তাঁদের ভেতরেই আটক করতে এল, সেই প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। ভিডিওতে দিপকেকে নারী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, “আপনারা আমাদের বেরিয়ে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন। আসুন, গ্রেপ্তার করুন। আমরা ভয় পাই না।”

অন্যদিকে, দিল্লির যন্তর মন্তরে এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কড়া ভাষায় পোস্ট দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি লিখেছেন, “এ সরকারকে বিদায় নিতে হবে।” আজ শনিবার সকালে এক্সে তিনি আরও লেখেন, “জ্ঞানেশ কুমারকে বিদায় নিতে হবে। এ সরকারকেও বিদায় নিতে হবে। এর পরই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হবে।” উল্লেখ্য, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতেই আজ যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির এই বিক্ষোভ কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল।

বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। সিজেপির আইনি-বিষয়ক প্রধান রত্না সিংকে আটক করেছে পুলিশ। আজ শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে সিজেপির পক্ষ থেকে রত্নার আটকের বিষয়টি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর কাব্য কর্ণাটককেও আটক করা হয়েছে, যিনি অনলাইনে ‘কেকে ক্রিয়েট’ নামে পরিচিত। সংবাদমাধ্যম এএনআই জানিয়েছে, দিল্লির উপকণ্ঠে ধাউলা কউন এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।

মুম্বাই থেকে দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কড়া বিধিনিষেধ নিয়ে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন অভিজিৎ দিপকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আমাদের বিক্ষোভ শুরুর আগেই মোদি পরাজয় মেনে নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরপাকড় এবং দিল্লি অচল করে দেওয়ার পদক্ষেপ শক্তির লক্ষণ নয়; বরং এমন নেতার লক্ষণ, যিনি নিজের জনগণকেই ভয় পান।”

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্যমতে, গত শুক্রবার দিবাগত রাতে দিল্লিতে অন্তত ১০০০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং আজ সকালে আরও প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংবেদনশীল এলাকায় তিনশ’র বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যেগুলোতে অডিও রেকর্ড করার সক্ষমতাও রয়েছে। লাউড-স্পিকারে সতর্ক করে বলা হচ্ছে যেন কেউ বিক্ষোভে যোগ না দেন, অন্যথায় আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।

পুলিশ দিল্লিজুড়ে লজ ও হোটেলে তল্লাশি চালাচ্ছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ, এয়ারবিএনবি এবং বাড়ির মালিকদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন বিক্ষোভকারীদের কক্ষ ভাড়া দেওয়া না হয়। এছাড়া ঘটনার সঠিক বিবরণ ধারণ করতে শত শত আলোকচিত্রী ও ভিডিওগ্রাফার নিয়োগ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এর মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর দাবির জবাব দেওয়া এবং তদন্তে সহায়তা পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতে দিল্লিতে এক বিক্ষোভের পর পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নারী বিক্ষোভকারীকে মারধর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছিল, যার ফলে পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে, জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও আটক করেছে গুরুগ্রাম পুলিশ। হরিয়ানা রাজ্যের এই এলাকায় পুলিশের নির্দেশনা না মানার কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে বলে হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিয়েছে পুলিশ। গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর কেন্দ্রীয় বিহার সোসাইটি আবাসিক এলাকায় তাঁর বাসায় পৌঁছে তাঁকে আটক করে পুলিশ। গুরুগ্রাম পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দিতে ধ্রুব রাঠিকে দিল্লি যেতে নিষেধ করা হয়েছিল।

নারী পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অশালীন আচরণ রোধ করতে যন্তর মন্তরে বিশেষ নারী দল ‘পিঙ্ক ফোর্স’ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি।

আটক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এএনআই-এর সাথে কথা বলার সময় অভিজিৎ দিপকে বলেছিলেন, “তারা যদি আমাকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে চায়, করুক। আমি তার জন্য প্রস্তুত। আমাকে গ্রেপ্তার করুক বা আটক করুক, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।” মুম্বাই থেকে দিল্লির পথে রওনা হওয়ার সময় তিনি এক্সে লিখেছিলেন, “যন্তর মন্তর ২.০ শুরু হয়ে গেছে। জ্ঞানেশ কুমার, ভোট চুরিতে আপনার সহায়তা করার দিন শেষ হয়ে গেছে।”

এই আন্দোলনে শরিক হতে ভারতে এসে ধ্রুব রাঠি নিজেও বলেছিলেন, “এটা গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। ১০ তারিখে কেউ দিল্লি আসতে ভুলবেন না।”

বিক্ষোভের আগে কেন্দ্রীয় সরকার দিল্লিকে কার্যত দুর্গে পরিণত করেছে এবং যানবাহন চলাচল সীমিত করেছে। এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে সিজেপি নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার ‘জেন জি-কে ভয় পাচ্ছে, তাই জরুরি অবস্থা’ জারি করেছে। বেঙ্গালুরু থেকে ফিরে মুম্বাই বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় অভিজিৎ বলেন, “তরুণদের এত ভয় পেলে পুরো দেশই বন্ধ করে দিন।”