গ্রেপ্তার হওয়ার প্রবল শঙ্কা করছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষ নেতৃত্ব। তাঁদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত যন্তর মন্তর অভিযান শুরু হওয়ার আগেই প্রশাসন তাঁদের আটক করতে পারে। কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করলে সরকার এক বিরাট ভুল করবে, কারণ দেশের যুবসমাজ এখন জাগ্রত।

আগামী ১০ অক্টোবর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং এসআইআরের প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে দিল্লিতে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযানের ডাক দিয়েছে সিজেপি। মুম্বাইয়ে আয়োজিত সমাবেশের সাফল্যের পরদিনই এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করে দলটির নেতারা। গতকাল রোববার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন সিজেপি নেতা সৌরভ দাস। সেই পোস্টেই তিনি গ্রেপ্তারের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।

সৌরভ এক্সে লিখেছেন, “সরকার আমাকে, অভিজিৎ (দিপকে), আশুতোষ (রাঙ্কা), রত্না (সিং) ও অন্যদের গ্রেপ্তার করার ছক কষছে। সরকার যদি মনে করে, এমন ধরনের স্বৈরাচারী আচরণ কাজে দেবে, তাহলে তারা ভুল করছে। যুবসমাজ জেগে উঠেছে। তারা এই ভুল বরদাশত করবে না।”

তিনি আরও লিখেছেন, “সবার কাছে আমাদের আবেদন, নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যতের জন্য লড়াই জারি রাখুন। সেই লড়াই আমাদের সঙ্গে লড়তে পারেন, আমাদের সঙ্গে না থেকেও লড়তে পারেন। কারাগারে যেতে বা আরও কিছু খারাপের জন্য আমরা প্রস্তুত।”

বার্তার শেষ অংশে সৌরভ লিখেছেন, “বিক্ষোভ চলবেই। ১০ অক্টোবর বিপুল সমাবেশ হবে। দেশবাসী তা নিশ্চিত করবে।”

সৌরভ দাসের এই পোস্টের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি পোস্ট করেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নাম উল্লেখ করে তিনি লেখেন, “কতজনকে গ্রেপ্তার করবেন অমিত শাহ? ১০ অক্টোবর সারা দেশ যন্তর মন্তরে আসবে।”

গান্ধীজয়ন্তীতে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক এলাকায় সফল বিক্ষোভ সমাবেশের পর ১০ অক্টোবরের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ ঘোষণার সময় সিজেপি নেতারা স্পষ্ট করে দেন, ওই দিন পুলিশ তাঁদের যেখানেই আটক করুক না কেন, সেই স্থানটিই হয়ে উঠবে যন্তর মন্তর।

উল্লেখ্য, বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ২ অক্টোবর থেকে লাগাতার যন্তর মন্তর অভিযানের ডাক দেওয়ার পর থেকে দিল্লি পুলিশ পুরো এলাকা ব্যারিকেড করে রেখেছে। রাজধানীর কোনো প্রান্ত থেকে কেউ যাতে যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে দিল্লিতে প্রতিদিন বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তি ও নাগরিক সমাজ বিক্ষোভ দেখাচ্ছে এবং তাঁদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

আবারও ভোট বর্জনের ডাক দিলেন দিপকে

সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে এর আগেও ভোট বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। আজ সোমবার পুনেতে তিনি পুনরায় সেই কথা জোরালোভাবে জানান। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমার যত দিন ক্ষমতায় রয়েছেন, যত দিন তাঁর তৈরি ভোটার তালিকা মেনে নির্বাচন হবে, তত দিন সেই ভোটে অংশ নেওয়া অর্থহীন। কারণ, সেই ভোটে কারা জিতবে, তা আগে থেকেই ঠিক করা রয়েছে।

নিজের এই মতামতের পক্ষে যুক্তি দিয়ে দিপকে বলেন, মোদি–হাওয়া যখন তুঙ্গে, তখনো যেসব রাজ্যে বিজেপি জিততে পারেনি, সেসব রাজ্যে এখন তারা হেলায় জিতছে। এটা হতে পারছে জ্ঞানেশ কুমারের বদান্যতায়। জ্ঞানেশ সরে গেলে ও এসআইআর ফ্রিজ হলে বোঝা যাবে, কত ধানে কত চাল। দেখা যাবে কটা আসন বিজেপি জেতে।

সুপ্রিম কোর্টে জ্ঞানেশ মামলার শুনানি আজ

আজ সুপ্রিম কোর্টে জ্ঞানেশ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। অন্য দুই কমিশনারকে অন্ধকারে রেখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন কি না, তা-ই এই মামলার মূল বিবেচ্য বিষয়। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার এজলাসে এই শুনানি চলবে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বিকাশ সিং এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন।

আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সদস্যসংখ্যা তিন। একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং বাকি দুজন নির্বাচন কমিশনার। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমিশনের ওপর ন্যস্ত। তিন কমিশনারের সহমতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার কথা এবং মতপার্থক্য দেখা গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে দেখা গেছে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি ক্ষেত্রে দুই নির্বাচন কমিশনার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের আপত্তি জানিয়েছেন, তা সত্ত্বেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার তা গ্রাহ্য না করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আবেদনকারীর আরও অভিযোগ, এভাবে জ্ঞানেশ কুমার ভোটার তালিকার ডেটাবেজের চরিত্র বিকেন্দ্রীকরণ না রেখে কেন্দ্রীভূত করেছেন এবং ফর্ম ৬–এ বেআইনিভাবে নতুন তথ্য সংযোজন করেছেন।

অন্যদিকে, দিল্লির আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠি আরেকটি মামলা করেছেন। তাঁর আবেদন, জ্ঞানেশ কুমার যেসব অনিয়ম করেছেন তা সংবিধানবিরোধী, তাই আইন অনুযায়ী তিনি রক্ষাকবচের অধিকারী হতে পারেন না। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ দেওয়া হোক। আবেদনকারীর দাবি, জ্ঞানেশ কুমারের নানা অনিয়মের তদন্তে সুপ্রিম কোর্ট একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করুন।

ইসির তীব্র সমালোচনা বর্তমান ও সাবেক বিচারপতিদের

সুপ্রিম কোর্টের শুনানির আগেই নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম, বিশেষ করে জ্ঞানেশ কুমারের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া ও সাবেক বিচারপতি রোহিনটন ফলি নরিম্যান।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিচারপতি ভূঁইয়া নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের কড়া সমালোচনা করে বলেন, “ভোটদানের অধিকার থেকে কোনো নাগরিককে বঞ্চিত করা শরীর থেকে প্রাণ কেড়ে নেওয়ার শামিল। নাগরিকদের ভোটাধিকারহীন নাগরিকে পরিণত করার কোনো যুক্তিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। লাখ লাখ মানুষকে এভাবে নিজের খামখেয়ালে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা সংবিধানের পরিপন্থী।”

বিচারপতি ভূঁইয়া আরও বলেন, একমাত্র মৃত ভোটারের নাম বাতিল করা ছাড়া আর কোনো নাম ভোটার তালিকা থেকে শুনানি ছাড়া বা নোটিশ না দিয়ে বাদ দেওয়া যায় না।

সাবেক বিচারপতি রোহিনটন ফলি নরিম্যান বলেছেন, অবৈধভাবে কোটি কোটি ভোটারের নাম কেটে গণতন্ত্রকে বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ গণতন্ত্রের মূল নির্যাস হলো ভোটদানের অধিকার। নির্বাচন কমিশনের এই সমালোচনার পাশাপাশি নরিম্যান কমিশনারদের নিয়োগ পদ্ধতিকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।

নরিম্যান বলেছেন, “আশা করি, সুপ্রিম কোর্ট মাথা তুলে দাঁড়াবেন এবং এই নিয়োগব্যবস্থার ভুল শুধরাবেন।” তাঁর মতে, এমন ধরনের অকাজ করে যাওয়া কোনো কমিশনের থাকাই উচিত নয়। তাই সুপ্রিম কোর্টের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কমিশনারদের নিয়োগপদ্ধতি ঠিক করা। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি অথবা তাঁর মনোনীত কারও নিয়োগপদ্ধতির শরিক হওয়া প্রয়োজন।

সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার সমালোচনা সিজেপির

সিজেপি নেতা সৌরভ দাস সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। গতকাল তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে এসআইআরের প্রক্রিয়া চলতে দেওয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা ঘিরে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর নাম উল্লেখ করে সৌরভ বলেন, তাঁরা বাংলা ও বিহারে এসআইআরের প্রক্রিয়া বাধাহীনভাবে চলতে দিয়েছেন। সময়মতো প্রয়োজনীয় মামলাগুলোর শুনানি না হওয়ায় ভোটাধিকার–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর মীমাংসা হয়নি। আদালতের এই ভূমিকা তরুণ প্রজন্মের ভোটাধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে সাধারণ মানুষের চোখে সুপ্রিম কোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা ধাক্কা খেয়েছে।

সৌরভের অভিযোগ, শুধু এসআইআর নয়, মহারাষ্ট্র সরকারের পতন, দিল্লির সাংবিধানিক সংকট ও রাজনৈতিক দলের ভাঙন নিয়ে দায়ের করা মামলাগুলোর শুনানিও যথাসময়ে শুরু হয়নি। এর সুবিধা পেয়েছে শাসক দল বিজেপি।