ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার একজন নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তার অভিযোগ করেছেন যে, বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “দুর্দিনে দলের পাশে ছিলাম, আর আজ সেই দলের লোকেরাই আমার বুকে লাথি মারছে।”

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে ময়মনসিংহ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসার সময় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি এসব কথা জানান।

সাথী আক্তার জানান, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি তাঁর তিনটি শোরুমে চুরির ঘটনা ঘটে, যার ফলে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। সেই মানসিক কষ্ট ও হতাশার কথা জানাতেই তিনি ফেসবুকে লাইভ করেন। তাঁর দাবি, “আমি শুধু আমার মনের কষ্ট প্রকাশ করেছি। সরকারবিরোধী কোনো কথা বলিনি।”

তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, ফেসবুক লাইভটি দেখার পর বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে জড়ো হন। ভালুকা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মার্কেটের সামনে তাঁকে লক্ষ্য করে গালাগাল করা হয়। সেই মুহূর্তে তিনি নিজের মুঠোফোনে ঘটনার ভিডিও রেকর্ড করছিলেন। তবে অভিযুক্তরা তাঁর কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেন এবং তাঁকে মারধর করেন।

সাথী আক্তার আরও জানান, বিএনপির কোনো সাংগঠনিক পদে তিনি না থাকলেও দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। সাবেক নেত্রী খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময়ে তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতেও তিনি শামিল ছিলেন। এমনকি ভালুকার বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর সঙ্গেও তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সাথী আক্তার বলেন, তিনি বর্তমানে অসুস্থ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন তিনি।

জানা গেছে, সাথী আক্তার ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকার খাদিজা প্যালেস মার্কেটে ‘সাথী বিউটি পার্লার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ আলীর কন্যা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার দুপুরে ‘সাথী মেকওভার’ নামক একটি ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে আসেন সাথী আক্তার। সেখানে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানে বারবার চুরির ঘটনা নিয়ে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি তাঁর দুটি শোরুম এবং আশপাশের কয়েকটি দোকান থেকে বৈদ্যুতিক তার, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তারসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি হয়েছে। এমনকি তাঁর বাসা থেকেও মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

একটানা চুরির ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথা জানান সাথী আক্তার। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ভোট দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “কাকে ভোট দিয়ে আজ এই ভুক্তভোগী হলাম!”

তাঁর এই বক্তব্যে বিএনপি সরকার ও দলের নেতাকর্মীদের সমালোচনা ফুটে ওঠে বলে মনে করা হয়। ফেসবুক লাইভটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী এবং এলাকাবাসীর একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। ওইদিন রাতে স্থানীয় লোকজন ও রাজনৈতিক কর্মীরা ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকায় তাঁর পার্লারে গিয়ে বক্তব্যের বিষয়ে কৈফিয়ত চান। এতে এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পার্লারে ভাঙচুর বা বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সাথী আক্তারকে থানায় নিয়ে যায়। পরদিন পুলিশ তাঁকে ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

ময়মনসিংহ আদালত পুলিশের পরিদর্শক পিএসএম মোস্তাছিনুর রহমান জানান, সাথী আক্তারকে ময়মনসিংহের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে তাঁর পক্ষে আইনজীবী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ শুনানিতে অংশ নেন। শুনানি শেষে ময়মনসিংহের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৬ষ্ঠ আদালতের বিচারক সাজিদুল ইসলাম তাঁকে ৫০০ টাকার মুচলেকায় জামিন প্রদান করেন।

পুলিশ পরিদর্শক আরও জানান, আদালত আগামী ৩ নভেম্বর পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ধার্য করেছেন এবং ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছেন। ওইদিন পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম কী হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।