‘আমি শুধু আমার মনের কষ্ট প্রকাশ করেছি। সরকারবিরোধী কোনো কথা বলিনি। অথচ বিএনপির নেতা–কর্মীরা এসে আমার ওপর হামলা চালিয়েছে। দুর্দিনে দলের পাশে ছিলাম, আর আজ সেই দলের লোকেরাই আমার বুকে লাথি মারছে।’ এই অভিযোগের কথাগুলো জানিয়েছেন ময়মনসিংহের ভালুকার একজন নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সাথী আক্তার। আজ বুধবার বেলা তিনটার দিকে আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসার সময় তিনি এমন কথা বলেন।

সাথী আক্তারের দাবি, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। সম্প্রতি তাঁর তিনটি শোরুমে চুরির ঘটনা ঘটে, যার ফলে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। সেই মানসিক কষ্ট ও ক্ষোভ থেকেই তিনি ফেসবুকে লাইভ করেছিলেন। তবে তাঁর অভিযোগ, সেই লাইভ করার পর তাঁকে চরম হয়রানি ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে।

ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করে সাথী আক্তার জানান, তাঁর তিনটি শোরুমের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) তার এবং বিদ্যুতের মিটারের তার চুরি হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে একটি শোরুমে নতুন করে চার কয়েল তার লাগাতে হয়েছে, যেখানে প্রতি কয়েল তারের দাম ১২ হাজার টাকা। এই আর্থিক ক্ষতি সামলানো তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ফেসবুক লাইভটি দেখার পর বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এসে জড়ো হন। ভালুকা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মার্কেটের সামনে তাঁকে লক্ষ্য করে গালাগাল করা হয়। সেই সময় তিনি নিজের মুঠোফোনে পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁকে মারধর করা হয়।

নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও সম্পৃক্ততার বিষয়ে সাথী আক্তার জানান, বিএনপির কোনো সাংগঠনিক পদে তিনি না থাকলেও দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। সাবেক নেত্রী খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময়ে তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতেও তিনি শামিল ছিলেন। এছাড়া ভালুকার বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা জানান তিনি।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সাথী আক্তার বলেন, তিনি বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর তিনি এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

উল্লেখ্য, সাথী আক্তার ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী এলাকার খাদিজা প্যালেস মার্কেটে ‘সাথী বিউটি পার্লার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ আলীর কন্যা।

গত রোববার বেলা দুইটার দিকে ‘সাথী মেকওভার’ নামের ফেসবুক আইডি থেকে তিনি দুটি লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেন। ৫ মিনিট ২২ সেকেন্ড এবং ৮ মিনিট ৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিও দুটিতে নিজের প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভিডিওর এক পর্যায়ে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে ভুক্তভোগী।’

এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করে বিচার দাবি করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ওই দিন রাত সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত সোমবার তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়।

আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শুনানি শেষে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাজিদুল ইসলামের আদালত সাথী আক্তারকে জামিন প্রদান করেন।

ময়মনসিংহ আদালত পুলিশের পরিদর্শক পিএসএম মোস্তাছিনুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, আজ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাথী আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়। তাঁর পক্ষে আইনজীবী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ শুনানিতে অংশ নেন। শুনানি শেষে আদালত তাঁকে ৫০০ টাকার মুচলেকায় জামিন দিয়েছেন।

মোস্তাছিনুর রহমান আরও জানান, আদালত আগামী ৩ নভেম্বর পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ধার্য করেছেন এবং ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছেন। ওই দিন পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়ার পর এই বিষয়ে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম কী হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।