ময়মনসিংহের ভালুকার একজন নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁর অপরাধ ঠিক কী ছিল? জানা গেছে, নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটার পর তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে একটি ফেসবুক লাইভে, যেখানে তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়া আজকে ভুক্তভোগী।’

সাথী আক্তারের এই কথাগুলো স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এর ফলে তারা তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি ঘেরাও করে এবং তাঁর বিচারের দাবি জানাতে শুরু করে। পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নেয় এবং গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

একজন নাগরিক হিসেবে তিনি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন এবং নিজের দেওয়া ভোটের সিদ্ধান্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে তাঁকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা কেবল একজন নারী উদ্যোক্তার হয়রানির গল্প নয়; বরং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল, পুলিশ ও বিচারিক ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

সাথী আক্তার দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি তাঁর দোকান থেকে বেশ কয়েকবার বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়েছে। শুধু তাঁরই নয়, আশপাশের অন্যান্য দোকানেও একই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। চুরি রোধ করা এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মৌলিক দায়িত্ব। তাই এই বিষয়ে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশের যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ ছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই ক্ষোভের কারণগুলো খতিয়ে দেখার পরিবর্তে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা অনেকটা মবের মতো তাঁর দোকানের সামনে জড়ো হন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নেতা মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, বিএনপিকে নিয়ে কথিত কটূক্তির কারণে দলীয় নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই নারীকে প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন। এখানে প্রশ্ন জাগে, একজন নাগরিকের বক্তব্য যদি কারও পছন্দ না হয়, তবে তাঁকে ‘প্রতিহত’ করার অধিকার ওই নেতা-কর্মীরা কোথায় পেলেন?

পুলিশের ভূমিকা এই ঘটনায় আরও বিস্ময়কর। ভালুকা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি ভিডিওটি একাধিকবার দেখেছেন এবং তাঁর মতে সাথীর বক্তব্য বাক্‌স্বাধীনতার পরিধির মধ্যেই ছিল। তবে তাঁর দাবি, পরবর্তীতে কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ওই নারীর মারমুখী আচরণ করায় উত্তেজনা তৈরি হয়, যার ফলে তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

কোনো বক্তব্য অশালীন বা আপত্তিকর মনে হতে পারে এবং তার প্রতিবাদ হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অসন্তোষের কারণে দলীয় নেতা-কর্মীরা একজন মানুষকে আটক করবেন এবং পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখাবে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো বক্তব্যকে সন্ত্রাসের অভিযোগ হিসেবে গণ্য করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনের নির্দিষ্ট উপাদান এবং তার অকাট্য প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলা সেই প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যাটি বিভ্রান্তিকর বলে মনে হয়। যাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করা হয়েছিল, তাঁকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টিতে ঘেরাওকারীদের ভূমিকা কী ছিল? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে কেন কেবল বক্তব্য প্রদানকারী ব্যক্তিটিকেই গ্রেপ্তার করতে হলো? ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারা সম্ভাব্য আমলযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত হয়। কেবল উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলে কাউকে এই ধারায় গ্রেপ্তার দেখানোর সুযোগ নেই।

যদি কেউ কোনো বক্তব্যে সংক্ষুব্ধ হন, তবে তাঁর উচিত আইনসম্মত পথ অনুসরণ করা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা এবং বক্তব্যদাতাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে বিচারের দাবি জানানো কোনোভাবেই আইনের শাসনের পথ হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনা অন্যদের জন্য এক ভয়াবহ বার্তা দেয় যে, ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করলে আইনি ও বেআইনি সব ধরনের হয়রানির শিকার হতে হবে।

ভালুকার এই ঘটনার সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে গত ২ এপ্রিল ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার অদ্ভুত মিল রয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে কথিত কটূক্তির অভিযোগে শাওন মাহমুদ নামের এক ব্যক্তির রেস্তোরাঁয় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের ২৫ থেকে ৩০ জন নেতা-কর্মী জড়ো হন। তাঁরা শাওনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন এবং পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করে।

যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে উপস্থিত যুবদলের নেতা-কর্মীরা বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনামূলক ওই পোস্ট তাঁরা মেনে নেবেন না। পুলিশও নিশ্চিত করেছে যে, দলীয় নেতা-কর্মীরাই শাওনকে আটক করে তাঁদের কাছে দিয়েছিলেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাটিকে সরকার-সমর্থকদের চাপে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার একটি উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত এই বিষয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। দলীয় নেতা-কর্মীরা কারও বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মববাজদের মতো তাঁর বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করবেন, তাঁকে আটক করবেন কিংবা পুলিশের ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করবেন—এমন আচরণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকেও রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে এই পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য।

কোনো বক্তব্য অশালীন বা আপত্তিকর মনে হতে পারে। তার প্রতিবাদও হতে পারে। কিন্তু সেই অসন্তোষের জেরে দলীয় নেতা–কর্মীরা একজন মানুষকে আটক করবেন, এরপর পুলিশ তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখাবে—এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো বক্তব্যকে সন্ত্রাসের অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনের নির্দিষ্ট উপাদান ও তার প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলা সেই প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

একই ধরনের আরও বেশ কিছু ঘটনার উদাহরণ দেওয়া সম্ভব; কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করা হয়েছে, কোথাও দলীয় নেতা-কর্মীরা নিজেরাই একজনকে আটক করে পুলিশের কাছে দিয়েছেন, কোথাও অনলাইন প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে হামলার অভিযোগ উঠেছে। সব ঘটনাতেই একটি প্রবণতা স্পষ্ট: ক্ষমতাসীন দলের একাংশ ভিন্নমত, সমালোচনা বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জবাব দিতে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছে; আর পুলিশের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়েছে, নাগরিকের অধিকার রক্ষার চেয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা অনুযায়ীই তারা কাজ করছে।

দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার সময় বিএনপির নেতা-কর্মীরাও মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব হওয়ার অভিজ্ঞতা দলটির অজানা থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইন ব্যবহার করে সাংবাদিক, বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ নাগরিককে হয়রানির যে অভিযোগ উঠেছিল, বিএনপি তার সমালোচনা করেছে।

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাজনৈতিক পরিচয়–নির্বিশেষে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির মূল্যায়ন হবে যাঁরা এখন সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাঁদের সঙ্গে সরকার ও দল কী আচরণ করে, তা দিয়ে।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে, যদিও আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের ব্যবস্থাও আছে। সেই বিধিনিষেধকে ক্ষমতাসীন দল বা নেতাদের সমালোচনা থেকে রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। রাষ্ট্র, সরকার ও ক্ষমতাসীন দল এক জিনিস নয়। সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ নয়; বরং সরকারের কাজের জবাবদিহি দাবি করা একটি গণতান্ত্রিক অধিকার।

সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। দলীয় নেতা-কর্মীরা কারও বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মববাজদের মতো তাঁর বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করবেন, তাঁকে আটক করবেন কিংবা পুলিশের ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করবেন—এমন আচরণ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাইলে এটুকু করতেই হবে।

— মনজুরুল ইসলাম, মুক্তকণ্ঠ র জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক। * মতামত লেখকের নিজস্ব।