দেশের ব্যাংক খাতের চরম বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, এই খাতটি প্রথমে ঋণখেলাপির সংস্কৃতির কারণে নষ্ট হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা হলেও ২০১০ সালের পর নতুন করে শুরু হয় ‘ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি’। তাঁর মতে, এই লুটপাটের প্রবণতার কারণেই আর্থিক খাত আজ এই শোচনীয় অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) কর্তৃক আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এসব কথা বলেন।
ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ঋণখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক কষ্টে নানা নিয়মকানুন তৈরি করা হয়, সংস্কার করা হয়। পাশাপাশি বিধিবিধান বানিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলাম। কিছু বেসরকারি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু এরপর শুরু হয় ব্যাংক লুটপাটের সংস্কৃতি। এটা আরও মারাত্মক। কোনো নিয়মকানুন ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়।’
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে জানান, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, কল্যাণ তহবিল ও পেনশনের অর্থ দিয়ে ব্যাংক খোলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে যায়। এর ফলে দরিদ্র ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কোটি কোটি টাকার পেনশন ও কল্যাণ তহবিল আটকে পড়ে, যা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ব্যাংক খাতের অতীত ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘এত বছরের ব্যাংকিং খাতের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমরা নতুন করে আবার শিখতে যাব কেন? অনেক বিতর্ক আমরা বহু আগেই করেছি। অতীতে আমরা উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো না বানিয়েই বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছিলাম। এর পরিণতি কী হয়েছিল? সেই সময় আমরা দেখেছি যে উদ্যোক্তা পরিচালকেরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩৫ শতাংশের সমান) ঋণ হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন।’
ব্যাংকিং খাতের একচ্ছত্র আধিপত্য রোধে আইনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী বা পরিবার একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি না, এ নিয়ে নিয়ম থাকা দরকার ছিল, যা ‘অ্যান্টি-ট্রাস্ট’ (একাধিপত্য–বিরোধী) আইনের আওতায় আসা উচিত। আমাদের এখনো কোনো অ্যান্টিট্রাস্ট বা অ্যান্টিমনোপলি আইন নেই।’
রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো অন্যায় সুযোগ-সুবিধা বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, রাজনৈতিক সরকার যদি রাজনৈতিক কারণে সুযোগ-সুবিধা বিতরণ করতেই চায়, তবে তারা এমন খাত বেছে নিক যাতে দেশের অর্থনীতির বড় কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু ব্যাংকিং খাত বা আর্থিক খাতের মাধ্যমে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করা একেবারেই অনুচিত। এটা রাজনৈতিক সরকারকেই বুঝতে হবে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা ব্যাংকারদের কিছু করার নেই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ২০১০ সালের পর কোনো যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ‘দলে দলে’ নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে সেগুলো দেউলিয়া হয়ে পড়ে। এসব দেউলিয়া ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত গ্রহণ করেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শিক্ষকদের পেনশনের টাকা আটকে যাওয়ার ঘটনাটি পুনরায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও কল্যাণ তহবিলের টাকা নিয়ে ব্যাংক খোলা হলেও পরে সেগুলো দেউলিয়া হয়ে যায় এবং দরিদ্র শিক্ষকদের কোটি কোটি টাকা এখনো আটকে আছে।
গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতের বিধিবিধান অতিরিক্ত শিথিল করার কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এখন দুর্বল ব্যাংককে উদ্ধার করতে হলে নিয়মকানুন আবার কিছুটা শিথিল করতেই হবে। কিন্তু অতীতে যেভাবে নিয়মকানুন শিথিল করেও আমরা আজকের এই খারাপ অবস্থায় এসে পৌঁছালাম, আবার সেটার পুনরাবৃত্তি হবে না, সেই গ্যারান্টি কোথায়?’
ব্যাংক খাতকে এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় বাতলাতে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলোকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমাদের পর্যাপ্ত সেফগার্ড (সুরক্ষা কবচ) রাখতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্র আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যেন সৎ, প্রকৃত উদ্যোক্তা ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা পৌঁছায়। এই ব্যবস্থা যদি আমরা সুনিশ্চিত করতে না পারি, তবে আমরা আবার আগের পুরোনো গর্তেই পতিত হব।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন। সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার।