প্রয়াত ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এক সময়ের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং অগ্রণী, সোনালী, কৃষি ও পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই সময়ে বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে পাঁচজন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অথচ তৎকালীন ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, একটি পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক থাকতে পারতেন। নিয়ম অনুযায়ী বাকি তিনজনকে পদত্যাগের অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংককে চিঠি পাঠায়। তবে বেসরকারি ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই চিঠির কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। উল্টো এর পরপরই সরকার আইন পরিবর্তন করে দেয়, যার ফলে এক পরিবার থেকে চারজন পরিচালক থাকার সুযোগ তৈরি হয়। সেই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, পরিচালকরা একটানা নয় বছর ব্যাংকে থাকতে পারবেন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পরিচালকদের মেয়াদ ও সংখ্যা বাড়ানোর বিল সংসদে উত্থাপনের সময় বলেছিলেন, ‘সংশোধনীটি বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করবে।’ তবে পর্দার আড়ালের কথা ছিল ভিন্ন; ওই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সরকার পুনরায় আইন সংশোধন করে। সেখানে নির্ধারিত হয়, একজন ব্যক্তি একই ব্যাংকের পরিচালক পদে টানা সর্বোচ্চ ১২ বছর থাকতে পারবেন এবং এরপর তিন বছরের বিরতি দিয়ে পুনরায় পরিচালক হতে পারবেন।

এই দুই দফায় আইন পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্রের বিস্তার ঘটে এবং বেশ কিছু ব্যাংক নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিবারের কবজায় চলে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার ব্যাংকমালিকদের এই পরিবারতন্ত্রের সুযোগ উপহার দিয়েছিল। আবার ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে তারা আরও একটি বিশেষ সুবিধা লাভ করেন। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাত যে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে এই পরিকল্পিত পরিবারতন্ত্র কায়েম করাকে দায়ী করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নিয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদও শেষ হয়েছে। বর্তমানে ক্ষমতায় বিএনপি সরকার। বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা থেকে উত্তরণের জন্য বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, যার মধ্যে ব্যাংক খাতের সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

তবে বাস্তব চিত্র বলছে, ব্যাংকিং খাতের এই পরিবারতন্ত্রের উচ্ছেদ হচ্ছে না, বরং কেবল পরিবারের মুখগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব কমাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল, বর্তমান সরকার সেখান থেকে সরে আসছে। ব্যাংকমালিকদের দাবির মুখে তারা একই পরিবারের তিনজনকে পরিচালক হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, যেখানে প্রস্তাব ছিল সর্বোচ্চ দুজন করার। এমনকি ঋণখেলাপি পরিচালকদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে না।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ১১ জন বড় ঋণগ্রহীতার ঋণ পুনঃতফসকিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। উল্লেখ্য, এই ঋণগ্রহীতাদের ঋণ চার বছর আগেও একবার পুনর্গঠন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল পরিকল্পনা ছিল ১৯৯৭ সালের দেউলিয়া আইনের আওতায় এই খেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোকে অনুমতি দেওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তার বিপরীত। যদি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে ঋণখেলাপিদের কাছে একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা যেত এবং এটি প্রমাণিত হতো যে ঋণ পরিশোধ না করার পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে মনে হয়।’

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সেই মন্তব্যটি এখনো পুরোপুরি প্রযোজ্য বলে মনে হচ্ছে।