ব্যাংকের মূল কাজ কেবল আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ বিতরণ করা নয়। বরং সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর করে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করাও ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে যখন ঋণের একটি বড় অংশ অনাদায়ী হয়ে পড়ে, তখন ব্যাংকের এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে যায়।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতার চিত্র নয়, বরং এটি পুরো অর্থায়নব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এত গভীর সংকট থেকে ব্যাংক খাত নিজেকে কতটা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর সহজ অর্থ হলো, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই বর্তমানে খেলাপি বা শ্রেণিকৃত হিসেবে গণ্য।
এই পরিসংখ্যান ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান, ঋণ আদায়ের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তবে এই সংকটের প্রকৃত সমাধান খুঁজতে হলে শুধু খেলাপি ঋণের অংক দেখলেই চলবে না, বরং এর পেছনের কারণ এবং অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবগুলো বুঝতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চললেও বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলে এস আলম, বেক্সিমকো ও নাসা গ্রুপের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে ঋণ বিতরণ, ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক জবাবদিহিতার বিষয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ঋণনীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির নিয়মাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালনা পর্ষদের দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলো ব্যাংক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে ঋণ প্রদান এবং নির্ধারিত সময়ে তা আদায় করা। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যবসার সম্ভাবনা, নগদ প্রবাহ, জামানতের মান এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু এসবের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ গুরুত্ব পেলে ঋণঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। আর ঋণের প্রকৃত অবস্থা সময়মতো প্রকাশ না করা হলে সেই ঝুঁকি আরও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়।
তবে সংকটের পুরো দায় কেবল ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। ঋণ পর্যালোচনা ও অনুমোদনকারী কর্মকর্তা, পরিচালনা পর্ষদ, নিরীক্ষক এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকাও গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ দায় নির্ধারণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, অতীতের অনিয়মের জবাবদিহি না থাকলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা থেকে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ছিল খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। এই তালিকায় রয়েছে জনতা, অগ্রণী, আইএফআইসি, ন্যাশনাল, এবি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
ব্যাংকভেদে পরিস্থিতির পার্থক্যও বেশ উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৭৫ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৯৭ শতাংশ এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে তা ৯৬ শতাংশের কাছাকাছি।
এই পরিসংখ্যানের তাৎপর্য হলো, সব ব্যাংকের সংকটের মাত্রা এক নয়। তাই সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের সমাধান কার্যকর হবে না। ব্যাংকভিত্তিক সম্পদের মান যাচাই, ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা নিরূপণ এবং ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী আলাদা পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের মোট অঙ্ককে সম্ভাব্য চূড়ান্ত ক্ষতির সমান ধরে নেওয়া যাবে না; বরং জামানত, গ্যারান্টি ও আদায়ের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হবে।
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংক খাতের সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। মূলধন ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়ার আর্থিক সুরক্ষা দেয়। অন্যদিকে, প্রভিশন হলো ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে সংরক্ষিত অর্থ। ঋণ আদায় না হলে প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে হয়; তা না হলে ব্যাংকের সম্পদ ও মুনাফার প্রকৃত অবস্থা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে নিট মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। দুটি পরিসংখ্যানের সময়কাল আলাদা হলেও এগুলো ব্যাংক খাতের আর্থিক দুর্বলতার গভীরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব আয়, মূলধন সংগ্রহ এবং ঋণ আদায়ের অগ্রগতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থ দিয়ে পুনর্গঠন করা হলে সেই সহায়তার শর্ত, ব্যবহার ও ফলাফল স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। কারণ, অনিয়মের দায় যেন নির্বিচারে করদাতাদের ওপর না পড়ে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি সহায়তার সঙ্গে সময়বদ্ধ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং দায় নির্ধারণ যুক্ত থাকা উচিত।
দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংকট মোকাবিলায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠানটির মূলধন শক্তিশালী করতে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে অর্থ বরাদ্দ, অনুমোদন ও প্রকৃত অর্থছাড়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; প্রকাশের আগে এ বিষয়ে সর্বশেষ সরকারি তথ্য যাচাই করা জরুরি।
একীভূতকরণের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন ও পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পাঁচটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে একত্র করলেই একটি শক্তিশালী ব্যাংক তৈরি হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। পুরোনো ঋণের প্রকৃত আদায়যোগ্যতা নির্ধারণ, সম্পদের মান যাচাই এবং দায়ের স্বচ্ছ হিসাব ছাড়া নতুন প্রতিষ্ঠানটিও পুরোনো সংকট বহন করতে পারে।
তাই একীভূতকরণের পাশাপাশি পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন তদারকি এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন ব্যাংকের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু মূলধন জোগানের ওপর নয়; বরং ঋণ আদায়, সম্পদের মান এবং পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর।
আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান শর্ত। ২০২৬ সালের আমানত সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে প্রতিটি সদস্য প্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক আমানতকারীর জন্য সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা সুরক্ষিত। একই প্রতিষ্ঠানে একজনের একাধিক হিসাব থাকলে সেগুলো একত্র করে সুরক্ষার সীমা নির্ধারণ করা হয়। ফলে প্রতিটি হিসাবের জন্য আলাদাভাবে দুই লাখ টাকা সুরক্ষা পাওয়া যায় না। আইনে নির্ধারিত কিছু প্রাতিষ্ঠানিক আমানতও এই সুরক্ষার বাইরে রয়েছে।
এই সুরক্ষা ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা দেখা দিলেই তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়; এটি মূলত আইননির্ধারিত পরিস্থিতি ও প্রক্রিয়ায় সুরক্ষিত আমানত পরিশোধের ব্যবস্থা। দুই লাখ টাকার বেশি আমানতের অতিরিক্ত অংশও সুরক্ষা তহবিল থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধযোগ্য নয়। তাই আমানত সুরক্ষার পাশাপাশি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা প্রকাশ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ঋণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে প্রথমত, বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে পার্থক্য করে ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি পূরণের সময়বদ্ধ পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরও স্বাধীন, তথ্যনির্ভর ও ঝুঁকিভিত্তিক করতে হবে। চতুর্থত, ঋণ অনুমোদন থেকে আদায় পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের ওপর মূলধনভিত্তিক ক্যাপ বা বাধ্যবাধকতা থাকলেও ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো ক্যাপ নেই। এমনকি এখানে রেগুলেটরি ক্যাপিটাল বা ন্যূনতম মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বা পরিমাণও অনেক কম।
আমাদের এখানে সংস্কারের অগ্রগতি বোঝার জন্য খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত, প্রভিশন ঘাটতি এবং পুনর্গঠিত ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। এতে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তব ফলাফলও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাংক খাতের ভূমিকা অপরিসীম। এই খাত দুর্বল থাকলে ভালো উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই ব্যাংক খাতের সংকটের সমাধান কেবল খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন ঋণশৃঙ্খলা, আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মের সমান প্রয়োগ।
ব্যাংক খাত ঠিক হবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করছে সংস্কারের সদিচ্ছা ও বাস্তবায়নের দৃঢ়তার ওপর। শুধু ঢিমেতালে মূলধন জোগান কিংবা ব্যাংক একীভূতকরণ দিয়ে টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। অতীতের অনিয়মের দায় নির্ধারণ, ঋণ আদায় এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করতে পারলেই আমানতকারীদের আস্থা ফিরবে। অন্যথায়, আজকের সংকট আগামী দিনের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর আরও বড় বোঝা হয়ে থাকবে।
— মামুন রশীদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক। সিটিব্যাংক এন এ বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের করপোরেট ও ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং প্রধান।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)