চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত এক জনমানবহীন প্রান্তর। স্থানীয়দের কাছে এই এলাকাটি ‘বেইলের মাঠ’ নামে পরিচিত। প্রায় আড়াই দশক আগেও এই মাঠটি ছিল অত্যন্ত নির্জন এবং জঙ্গলে ঘেরা, যেখানে মানুষের যাতায়াত ছিল নেই বললেই চলে। ঠিক এই নির্জন মাঠেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ নামের একটি আশ্রম। সাড়ে সাত শতক জমির ওপর নির্মিত এই আশ্রমের একটি টিনের চালার নিচে রয়েছে মাটির গভীরে নেমে যাওয়া সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলে দেখা মেলে সুড়ঙ্গের মতো অন্ধকার একটি কক্ষের। সেখানে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ধ্যান ও আধ্যাত্মিক সাধনা করে আসছেন লাভলী শাহ ফকির রানী নামের এক নারী।

আশ্রমে আরও একটি টিনের ঘর রয়েছে। সেখানে নিজের ছবির সামনে বসে সাধনায় মগ্ন থাকেন লাভলী শাহ। ওই ঘরে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি এবং ছবিও রাখা হয়েছে। এই নির্জন আশ্রমে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী এবং সেবাযত্নে নিয়োজিত রয়েছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা দুজন খাদেম। তাদের মধ্যে একজন মাহবুব আলম বাচ্চুর বাড়ি রাজবাড়ী জেলায় এবং অন্যজন আলভী বেগমের বাড়ি রংপুর জেলায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, লাভলী শাহ এখানে আসার আগে এই মাঠে কোনো ফসল ফলত না। কিন্তু বর্তমানে সেখানে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। তাদের দাবি, বিভিন্ন আখড়া বা আশ্রম নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা প্রচলিত থাকলেও ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’-এ তেমন কিছু নেই। লাভলী শাহ এবং তার খাদেমেরা মূলত ধ্যান ও মানবসেবার মাধ্যমেই তাদের সময় অতিবাহিত করেন।

দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে এই আশ্রমে সেবায় নিয়োজিত খাদেম মাহবুব আলম বাচ্চু বলেন, “এটা দমের মাদারের দরবার। দমের মাদার বলতে মা বোঝায়। মা আর আমি এখানে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সাধনা করছি। এখানে সাধুসঙ্গও হয়। ফলসেবা দেওয়া হয়।”

নিজের গর্ভে সন্তান না থাকলেও জীবনের দীর্ঘ সময়ে কুড়িয়ে পাওয়া ২০ জনেরও বেশি এতিম ও পথশিশুকে মমতার সাথে লালন-পালন করে বড় করেছেন লাভলী শাহ। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগলেও মানুষের কল্যাণে তার ধ্যান ও সাধনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তবে তার এই দীর্ঘ আধ্যাত্মিক যাত্রাপথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। লাভলী শাহর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্জন মাঠের এই আশ্রমে অতীতে তাকে একাধিকবার ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের কবলে পড়তে হয়েছে। এমনকি পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া লালন শাহকে নিয়ে লেখা তার সংগ্রহে থাকা একটি অত্যন্ত মূল্যবান ডায়েরিও হারিয়ে গেছে।

নিজের অতীত স্মৃতি সম্পর্কে লাভলী শাহ খুব বেশি কিছু মনে করতে পারেন না। তার বয়স কত, বাবা-মা কে কিংবা কোথায় তার জন্ম— এসব বিষয়েও তার স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে তার দাবি, তিনি সুদূর ইরাক থেকে প্রথমে পাকিস্তান, এরপর ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে লাভলী শাহ বলেন, “মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি ইরাকে ছিলেন। সেখানে এক ব্যারিস্টারের বাড়ির বাইরে তার দিন কাটত। পরে ১১ বছর বয়সে এক সাধু তার নাম রাখেন লাভলী। ওই গুরুর সান্নিধ্যেই তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষা নেন। পরে লালন শাহের দর্শনে উদ্বুদ্ধ হন।”

লাভলী শাহর দাবি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগেই তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ২০০০ সালে ঘোলদাড়ী গ্রামের এই নির্জন প্রান্তরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার আগে তিনি অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও ভারত ভ্রমণ করেছেন বলে জানান তিনি।

মাটির নিচের কক্ষে সাধনার বিষয়ে লাভলী শাহ বলেন, “এই জায়গাটা আমি ১৯৭৯ সাল থেকে খুঁজে বেড়াতাম, পাইতাম না। অনেক তদন্ত করে খুঁজে ২০০০ সালে এখানে আসি। সর্বক্ষণ ওই ধ্যানের মাধ্যমেই থাকতাম। দিনের বেলা ছেলেপেলেদের সঙ্গে থাকতাম, আর রাতে সুড়ঙ্গে আমার কাজগুলো করতাম। সাধনা আরকি।”

আশ্রমে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতি এবং দেবদেবীর মূর্তি রাখার কারণ ব্যাখ্যা করে লাভলী শাহ বলেন, “মানবধর্মই বড় ধর্ম। তাই আশ্রমে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিলে কোনো জাতপাত বা ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। মানবধর্ম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাই এখানকার মূল শিক্ষা।”

লাভলী শাহ জানান, তিনি সরকারি কোনো সাহায্য বা অনুদান পাননি। তবে এই বিষয়ে কারও প্রতি তার কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। মানুষের ভালোবাসা নিয়েই জীবনের বাকি সময়টুকু কাটাতে চান তিনি।

নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে লাভলী শাহ বলেন, “কোনো সরকার অনুদান দেয় নাই, তাতে কিছু না। আমার মৃত্যুর পর এখানে আমারে রাইখা দিও। এখান থেকেই আরকি একটা কিছু হয়ে যাবে, যেমন শাহ আলী হলো, মখদুম শাহ হলো, লালন হলো।”