বাংলা ১ম পত্রের সৃজনশীল প্রশ্নের আলোকে লালন শাহর ‘মানবধর্ম’ কবিতার মূলভাব এবং মাদার তেরেসার মানবসেবামূলক জীবনের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ এখানে উপস্থাপন করা হলো।

উদ্দীপক হিসেবে মাদার তেরেসার জীবনচরিত তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ছিলেন একজন মহীয়সী নারী এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। জাত-ধর্মের সংকীর্ণ ভেদাভেদ ভুলে মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি একনিষ্ঠভাবে অসহায় মানুষের সেবা করেছেন। গভীর মমতা ও অকুণ্ঠ ভালোবাসা নিয়ে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তিনি, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল মানুষের স্থান সবার ওপরে।

এই প্রেক্ষাপটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও তার বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

প্রশ্ন ক: লালন শাহ কিসের রূপ দেখেননি?
উত্তর: লালন শাহ জাতের রূপ দেখেননি।

প্রশ্ন খ: লোকে জাতপাত নিয়ে গৌরব করে কেন?
উত্তর: মূলত সংকীর্ণ মানসিকতার কারণেই মানুষ জাতপাত নিয়ে গৌরব করে থাকে। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সমাজে জাতপাত কেন্দ্রিক বিভেদ বিদ্যমান। সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ সাধারণত নিজেদের বংশ ও জাত নিয়ে গর্ব করে এবং আস্ফালন দেখায়। এর ফলে সমাজের নিচুতলার প্রান্তিক মানুষগুলো প্রতিনিয়ত নিগৃহীত হয়। বস্তুত, উচ্চবিত্তরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বের জানান দেওয়ার লক্ষ্যেই তারা জাতপাত নিয়ে গর্ব করে থাকে।

প্রশ্ন গ: উদ্দীপকের সঙ্গে ‘মানবধর্ম’ কবিতার সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানবতাকে জীবনের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার দিক থেকে উদ্দীপকের সঙ্গে ‘মানবধর্ম’ কবিতাটি সাদৃশ্যপূর্ণ।

‘মানবধর্ম’ কবিতায় কবি জাত-ধর্মের যাবতীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছেন। কবির মতে, কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়গত পরিচয়ের চেয়ে মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয়টিই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাই জাত-ধর্ম নিয়ে অযথা বাড়াবাড়ি করা মোটেও সমীচীন নয়। এটাই হলো ‘মানবধর্ম’ কবিতার মূল সুর।

অন্যদিকে, উদ্দীপকে মহান মানবসেবী মাদার তেরেসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি মানবসেবাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছিলেন বলেই তিনি মানবতাকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছিলেন। একইভাবে ‘মানবধর্ম’ কবিতায় কবি লালন শাহ মানবতার জয়গান গেয়েছেন। মানবতাবাদী হওয়ার কারণে তিনি জাত-ধর্মের কৃত্রিম বিভাজনে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর কাছে দেশ, কাল, পাত্র ও ধর্মের চেয়ে মানবধর্মই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ, আলোচ্য কবিতা এবং উদ্দীপক—উভয় ক্ষেত্রেই মানবতাকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই দিক থেকেই উদ্দীপকের সঙ্গে কবিতার সাদৃশ্য প্রতীয়মান হয়।

প্রশ্ন ঘ: ‘উদ্দীপক ও “মানবধর্ম” কবিতার মূলসুর এক।’—উক্তিটি উদ্দীপক ও ‘মানবধর্ম’ কবিতার আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ধর্ম ও জাতিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার দিক থেকে উদ্দীপক এবং ‘মানবধর্ম’ কবিতায় একই সুর ধ্বনিত হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে মানবধর্ম তথা মনুষ্যত্ববোধের মধ্যেই মানুষের আসল পরিচয় নিহিত থাকে। একজন মানুষ যখন মানবতাবোধের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, তখনই সেটি তার শ্রেষ্ঠ পরিচয় হয়ে ওঠে। ‘মানবধর্ম’ কবিতায় কবি লালন শাহ ঠিক এই কথাটিই বোঝাতে চেয়েছেন।

উদ্দীপকটিতে মাদার তেরেসার মানবপ্রেমের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। আর তাই ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে গরিব-দুঃখী মানুষের সেবায় তিনি নিজের সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন। মানুষকে ভালোবেসে তিনি মানবসেবাকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আলোচ্য কবিতার কবিও একইভাবে মানবতাবাদে আস্থাশীল।

‘মানবধর্ম’ কবিতায় মানবতাবাদে বিশ্বাসী কবি মনে করেন, পাত্রভেদে জলকে ভিন্ন ভিন্ন নামে আখ্যায়িত করলেও তা যেমন জলই থাকে, তেমনই জাতি বা ধর্ম পরিচয় মানুষের মানবিক সত্তাকে পৃথক করতে পারে না। আর তাই ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের নিরিখে মানুষে মানুষে বিভেদ করা উচিত নয়। একইভাবে উদ্দীপকের মাদার তেরেসা একজন মানবসেবী। জাতি-ধর্মের বিভেদের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দিয়েছেন বলেই তিনি মানবকল্যাণে ব্রতী হয়েছেন। অর্থাৎ, এই কবিতা ও উদ্দীপক উভয় ক্ষেত্রেই ধর্ম ও জাতিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে মানবতার স্থান স্বীকৃত। সে বিবেচনায় প্রশ্নের মন্তব্যটি যথাযথ।

— সংগৃহীত: মাহফুজা হোসনে আরা, প্রভাষক, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, তেজগাঁও, ঢাকা।